মহাকাশে মঙ্গলের মতো বিশাল শূন্যতায় পাড়ি জমানোর আগে নাসার দরকার কিছু সাহসী স্বেচ্ছাসেবী। মানুষ সবশেষ চাঁদে গেছে ৫০ বছরেরও বেশি আগে। নাসা এখন জোরকদমে প্রস্তুতি নিচ্ছে আবারও চাঁদে ফেরার। সম্ভাব্য সময় ধরা হয়েছে ২০২৮ সাল। তবে এটি কেবল চাঁদে যাওয়ার মিশন নয়, বরং এর আড়ালে বোনা হচ্ছে আরও বিশাল এক স্বপ্ন—মঙ্গলে মানুষের প্রথম পদার্পণ। কিন্তু মহাকাশের এই বিশাল শূন্যতায় পাড়ি জমানোর আগে নাসার দরকার কিছু সাহসী স্বেচ্ছাসেবী। লাল গ্রহে যাওয়ার আগে তাদের পৃথিবীর বুকেই টানা এক বছর এমন এক জায়গায় কাটাতে হবে, যা হুবহু মঙ্গলের পরিবেশের মতো করে তৈরি।
এমএমইএ প্রকল্প: কী এবং কেন?
এই বিশেষ প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে মুন অ্যান্ড মার্স এক্সপ্লোরেশন অ্যানালগ, সংক্ষেপে এমএমইএ। এটি মূলত এক বছর দীর্ঘ একটি সিমুলেশন মিশন। মহাকাশের দীর্ঘ যাত্রায় নভোচারীদের যে ধরনের একাকিত্ব, বন্দিদশা এবং দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, ঠিক তার সবটুকুই কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হবে এখানে। এই প্রজেক্টের মূল উদ্দেশ্য নাসার নতুন কোনো রকেট বা স্পেসস্যুটের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা নয়, বরং মানুষের সহ্যক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষা নেওয়া। একটি বদ্ধ জায়গায় দিনের পর দিন আটকে থাকলে মানুষের মন কীভাবে কাজ করে, সেটাই দেখতে চান বিজ্ঞানীরা।
মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর পেছনের আসল চ্যালেঞ্জটা হলো, পৃথিবী থেকে এত দূরের এক অচেনা পরিবেশে মানুষের টিকে থাকার প্রতিটি দিক নিখুঁতভাবে বুঝতে পারা। নির্বাচিত স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা একটি হ্যাবিটেট বা বাসস্থান তৈরি করা হয়েছে। চার দেয়ালের এই আবদ্ধ জায়গাতেই তাদের থেকে কাজ করতে হবে। এর মধ্যে গবেষকরা স্বেচ্ছাসেবীদের প্রতিটি আচরণ খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করবেন। একটি দলের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে কাজ করে, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য কেমন থাকে, বাসস্থানের যন্ত্রপাতি কীভাবে তারা পরিচালনা করছেন—এ সব কিছুই থাকবে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে।
স্বেচ্ছাসেবীদের দৈনন্দিন রুটিন
আপনাকে যদি সেখানে পাঠানো হয়, তবে দৈনন্দিন রুটিন মেনে হ্যাবিটেটের রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হবে। এমনকি মাঝে মাঝে কৃত্রিমভাবে জরুরি অবস্থাও তৈরি করা হবে। যেমন হঠাৎ অক্সিজেন কমে যাওয়া বা পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। পৃথিবী থেকে লাখো মাইল দূরে মঙ্গলে গেলে নভোচারীদের জীবন ঠিক যেমন হবে, সেই কঠোর রুটিনটাই আপনাকে এখানে রপ্ত করতে হবে।
মঙ্গলে মানুষ পাঠানো মানে শুধু বিশাল একটা রকেট বানিয়ে ফেলা নয়। এর পেছনের আসল চ্যালেঞ্জটা হলো, পৃথিবী থেকে এত দূরের এক অচেনা পরিবেশে মানুষের টিকে থাকার প্রতিটি দিক নিখুঁতভাবে বুঝতে পারা। প্রযুক্তি হয়তো আপনাকে মঙ্গলে পৌঁছে দেবে, কিন্তু সেখানে টিকে থাকতে হলে মানুষের মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতার কোনো বিকল্প নেই। বিপদে পড়লে কেউ আপনাকে বাঁচাতে আসবে না, নিজেদের সমস্যা নিজেদেরই সমাধান করতে হবে। সেই চূড়ান্ত পরিস্থিতির জন্য মানুষের মনকে প্রস্তুত করতেই নাসার এই আয়োজন।
পূর্ববর্তী সিমুলেশন মিশনের অভিজ্ঞতা
নাসার এই এমএমইএ প্রোগ্রামটি মূলত তাদের আগের দুটি সিমুলেশন মিশনের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এর একটি হলো হেরা বা হিউম্যান এক্সপ্লোরেশন রিসার্চ অ্যানালগ। এর মাধ্যমে মহাকাশযাত্রার সময় একাকিত্বের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করা হয়। অন্যটি হলো চ্যাপিয়া বা ক্রু হেলথ অ্যান্ড পারফরম্যান্স এক্সপ্লোরেশন অ্যানালগ। এটি মূলত মঙ্গলের পৃষ্ঠে জীবনযাপনের একটি নিখুঁত সিমুলেশন। নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরবর্তী এমএমইএ মিশনটি ২০২৭ সালের আগস্ট মাসের আগে শুরু হচ্ছে না। এই লম্বা সময়টা নাসা কাজে লাগাবে সঠিক স্বেচ্ছাসেবী বাছাই করে তাদের এক বছরের দীর্ঘ বন্দিদশার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করার কাজে।
এই মিশনে অংশ নেওয়ার কিছু চমৎকার দিকও আছে। আপনি হয়তো সত্যি সত্যি মহাকাশে যাচ্ছেন না, কিন্তু ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে আপনাকে দিয়ে মহাকাশে হাঁটার বাস্তবসম্মত সিমুলেশন করানো হবে। তবে এর সঙ্গে আপনাকে মেনে নিতে হবে একটি কঠিন শর্ত—বাধ্যতামূলক সোশ্যাল মিডিয়া ডিটক্স। অর্থাৎ, টানা এক বছর আপনার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের কোনো উপায় থাকবে না। মঙ্গলে গেলে যেমন পৃথিবীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কোনো সুযোগ থাকে না, সেই চরম বিচ্ছিন্নতার বাস্তবতাটাই আপনাকে এখানে মানতে হবে।
আবেদনের শর্তাবলী
শুরুতেই জানিয়ে রাখি, নাসা এই সিমুলেশনের জন্য আলাদাভাবে কোনো আবেদনের প্রক্রিয়ার কথা প্রকাশ করেনি। তবে এর আগে চ্যাপিয়া মিশনে যে রিকয়ারমেন্টগুলো ছিল, সেগুলো এখানে বলছি। হয়তো, একই প্রক্রিয়ায় এই মিশনের জন্যও স্বেচ্ছাসেবী নেওয়া হবে।
নাগরিকত্ব: নাসার এই প্রজেক্টে আবেদনের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো, আবেদনকারীকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অথবা সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রার্থীদের সাধারণত এই মিশনে নেওয়া হয় না। তাই বাংলাদেশ থেকে চাইলেও আপনি আবেদন করতে পারবেন না।
বয়স ও শারীরিক যোগ্যতা: আবেদনকারীর বয়স ৩০ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে হতে হবে। প্রার্থীকে শারীরিকভাবে শতভাগ সুস্থ হতে হবে এবং কোনোভাবেই ধূমপানের অভ্যাস থাকা চলবে না। নির্বাচিত হওয়ার আগে নাসার নভোচারীদের জন্য নির্ধারিত দীর্ঘমেয়াদি মেডিকেল পরীক্ষায় পাস করতে হবে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা: যেকোনো বিষয়ে পড়লে হবে না। সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং বা গণিতের যেকোনো একটিতে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকতে হবে। এ ছাড়া কেউ যদি মেডিসিনে ডিগ্রিধারী হন কিংবা কোনো স্বীকৃত টেস্ট পাইলট স্কুলের কোর্স সম্পন্ন করে থাকেন, তবে তারাও আবেদন করতে পারবেন।
পেশাগত অভিজ্ঞতা: শুধু ডিগ্রি থাকলেই হবে না, স্টেম (সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাথ) ফিল্ডে অন্তত দুই বছরের পেশাগত কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। অথবা, পাইলট হিসেবে জেট বিমান চালানোর অন্তত এক হাজার ঘণ্টার অভিজ্ঞতা থাকলেও আবেদন করা যাবে।
ভাষায় দক্ষতা: হ্যাবিটেটে থাকা অন্যান্য ক্রু এবং বাইরে থাকা মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখার জন্য ইংরেজিতে খুব ভালো দক্ষতা থাকতে হবে।
কোথায় ও কীভাবে আবেদন করতে হয়
নাসা যখন এই মিশনগুলোর জন্য নতুন ক্রু খোঁজে, তখন তারা তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে (যেমন: nasa.gov/chapea) বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে থাকা পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করে আবেদন করতে হয়। আবেদন করার পর নাসা কয়েক ধাপে ইন্টারভিউ এবং শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা নিয়ে চূড়ান্ত স্বেচ্ছাসেবী নির্বাচন করে।
মহাকাশ অভিযানের ইতিহাস সব সময়ই মানুষের অসীম সাহসের গল্প বলে। মঙ্গলের বুকে যেদিন মানুষ প্রথম পা রাখবে, সেদিন হয়তো ইতিহাস বইয়ে কেবল নভোচারীদের নামই লেখা থাকবে। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক যাত্রার পেছনে পৃথিবীর বুকে চার দেয়ালে বন্দি থাকা এই স্বেচ্ছাসেবীদের অবদান কোনো অংশে কম থাকবে না। সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান



