ভবঘুরে গ্রহের চাঁদে প্রাণের সম্ভাবনা: টাইডাল হিটিং ও হাইড্রোজেনের জাদু
ভবঘুরে গ্রহের চাঁদে প্রাণের সম্ভাবনা

ভবঘুরে গ্রহের চাঁদে প্রাণের সম্ভাবনা: নতুন গবেষণার চমকপ্রদ ফলাফল

মহাকাশের গভীর অন্ধকারে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো গ্রহগুলো, যাদের কোনো নিজস্ব নক্ষত্র বা ঠিকানা নেই, বিজ্ঞানীদের কাছে পরিচিত রোগ প্ল্যানেট বা ভবঘুরে গ্রহ নামে। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের ছায়াপথে যতগুলো নক্ষত্র আছে, প্রায় ততগুলোই ভবঘুরে গ্রহ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। আর এসব গ্রহের অনেকগুলোরই নিজস্ব চাঁদ রয়েছে, যার কিছুটা আকারে আমাদের পৃথিবীর সমান হতে পারে।

টাইডাল হিটিং: তরল পানির রহস্য উন্মোচন

জার্মানির মিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডেভিড ডালবুডিং ও তাঁর দলের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, সূর্য থেকে বহু দূরে অবস্থিত এসব ভবঘুরে গ্রহের চাঁদে তরল পানি এবং সম্ভাব্য প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে। প্রশ্ন উঠতে পারে, সূর্যের আলো ছাড়া এসব চাঁদে তাপ আসবে কোথা থেকে? উত্তরটি লুকিয়ে আছে টাইডাল হিটিং বা জোয়ার-ভাটা জনিত তাপে

গ্রহের বিশাল মহাকর্ষ বল যখন তার চাঁদকে নিজের দিকে টানে এবং ছাড়ে, তখন চাঁদের অভ্যন্তরে একধরনের ঘর্ষণ সৃষ্টি হয়। এই ঘর্ষণের ফলেই ভেতর থেকে বিপুল পরিমাণ তাপ উৎপন্ন হয়। আমাদের সৌরজগতের শনি গ্রহের চাঁদ এনসেলাডাস বা বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপাতেও এই একই প্রক্রিয়ায় বরফের স্তরের নিচে বিশাল তরল মহাসাগর টিকে আছে। এমনকি বৃহস্পতির চাঁদ আইওতে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের পেছনেও সূর্যের ভূমিকা নেই, বরং পুরোটাই টাইডাল হিটিংয়ের খেলা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হাইড্রোজেন গ্যাস: তাপ ধরে রাখার জাদুকরী সমাধান

কিন্তু ইউরোপা বা এনসেলাডাসের মতো চাঁদে বরফের আচ্ছাদন থাকায় ভেতরের তাপ বাইরে যেতে পারে না। ভবঘুরে চাঁদের পৃষ্ঠে তরল পানি থাকলে, বরফের আচ্ছাদন ছাড়া সেই তাপ কীভাবে আটকে রাখা যাবে? শুরুতে গবেষক জুলিয়া রোসেটি ধারণা করেছিলেন, কার্বন ডাই-অক্সাইডের বায়ুমণ্ডল তাপ ধরে রাখতে পারে। কিন্তু উচ্চ চাপে কার্বন ডাই-অক্সাইড জমে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এখানেই হাইড্রোজেন গ্যাস একটি চমকপ্রদ বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়। হাইড্রোজেন অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় ছাড়া তরল বা বরফ হয় না। সাধারণত হাইড্রোজেন গ্যাস তাপ ধরে রাখতে পারে না, কিন্তু প্রচণ্ড চাপের অধীনে অণুগুলোর মধ্যে অবিরাম সংঘর্ষ ঘটে, যা কলিশন-ইনডিউসড অ্যাবজরপশন নামে পরিচিত। এই প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন গ্যাস একটি গ্রিনহাউস কম্বলের মতো কাজ করে, টাইডাল হিটিংয়ের তাপকে আটকে রেখে চাঁদের পৃষ্ঠে তরল পানির জন্য পর্যাপ্ত উষ্ণতা সৃষ্টি করে।

গবেষণার ফলাফল: দীর্ঘমেয়াদী তরল পানির সম্ভাবনা

গবেষকেরা কম্পিউটার সিমুলেশন ব্যবহার করে দেখিয়েছেন, যদি এমন কোনো চাঁদে পৃথিবীর সমান বায়ুমণ্ডলীয় চাপ থাকে, তবে সেখানে সাড়ে ৯ কোটি বছর পর্যন্ত পানি তরল অবস্থায় থাকতে পারে। আর চাপ যদি পৃথিবীর চেয়ে ১০০ গুণ বেশি হয়, তবে পানি তরল থাকতে পারে টানা ৪৩০ কোটি বছর, যা আমাদের পৃথিবীর বয়সের সমান।

প্রাণ সৃষ্টির পরিবেশ: জোয়ার-ভাটার ভূমিকা

যেখানে তরল পানি আছে, সেখানে প্রাণ সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আরএনএ তৈরির সুযোগ থাকে। ভবঘুরে গ্রহের চাঁদের কক্ষপথ সাধারণত উপবৃত্তাকার হওয়ায়, পৃষ্ঠে বিশাল জোয়ার-ভাটা তৈরি হয়। পৃথিবীতে চাঁদের আকর্ষণে জোয়ার-ভাটা হয়, কিন্তু এখানে গ্রহের আকর্ষণে চাঁদে জোয়ার-ভাটা ঘটে। এই ক্রমাগত ভেজা ও শুকনো চক্র আরএনএ তৈরির জন্য আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করে, যা পৃথিবীতে প্রাণের সঞ্চারের প্রাথমিক ধারণার সাথে মিলে যায়।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা: প্রযুক্তির উন্নতি ও অনুসন্ধান

এখনো পর্যন্ত সরাসরি এমন কোনো ভবঘুরে গ্রহের চাঁদের খোঁজ পাওয়া যায়নি, কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী, আমাদের গ্যালাক্সিতে শত শত কোটি চাঁদ থাকার সম্ভাবনা প্রবল। প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির সাথে সাথে, এমন চাঁদের খোঁজ পাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কে জানে, হয়তো একদিন আমরা সত্যিই সূর্যহীন চাঁদে প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পাব, যা মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আমূল বদলে দিতে পারে।