সূর্যের ভয়ংকর অগ্ন্যুৎপাত: সোমবার পৃথিবীতে আঘাত হানতে পারে তীব্র সৌরঝড়
সূর্যের ভয়ংকর অগ্ন্যুৎপাত: সোমবার পৃথিবীতে আঘাত হানতে পারে সৌরঝড়

সারা সপ্তাহ ধরেই যেন অশান্ত হয়ে আছে সূর্য। একের পর এক অগ্নিশিখা ও চৌম্বকীয় গ্যাসের মেঘ ছুড়ে দিচ্ছে সৌরজগতে; যেন কোনও শহরে অবিরাম আতশবাজি ফুটছে। এত দিন সেগুলোর বেশির ভাগই লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও এবার সরাসরি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে সূর্যের একটি প্রকাণ্ড অংশ। সোমবার (৮ জুন) এই তীব্র সৌরঝড় পৃথিবীতে আঘাত হানতে পারে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা।

সৌর বিস্ফোরণ ও কোর ফিলামেন্ট

৬ জুন সকালে সূর্যের অ্যাক্টিভ রিজন ৪৪৬১ নামক একটি অংশ থেকে মাঝারি মাত্রার এম১.৮ শ্রেণির একটি সৌর বিস্ফোরণ ঘটে। তবে মহাকাশ আবহাওয়াবিদদের সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে এর ভেতরে থাকা একটি ‘কোর ফিলামেন্ট’। অত্যন্ত ঘন, তীব্র গতিসম্পন্ন ও শক্তিশালী চৌম্বকীয় ক্ষমতাসম্পন্ন এই গ্যাসের নদীটি বর্তমানে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার বেগে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসছে।

ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের সতর্কতা

যুক্তরাষ্ট্রের সূর্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা স্পেস ওয়েদার প্রেডিকশন সেন্টার (এসডব্লিউপিসি) ইতোমধ্যে এই ঘটনার পর একটি শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় সৃষ্টির সতর্কতা জারি করেছে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি লোহা বা পাথরের তৈরি কোনও সেতু নয়, বরং বিদ্যুতের তৈরি এক প্রকাণ্ড সেতু। এটি সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডলের অদৃশ্য চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের ওপর ভর করে ভেসে থাকে। ফিলামেন্টের ভেতরের আয়নিত প্লাজমা তাপমাত্রা সাধারণত ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়, যা সূর্যের চারপাশের কোটি ডিগ্রি তাপমাত্রার তুলনায় বেশ ঠাণ্ডা ও ভারী। যখন একে ধরে রাখা চৌম্বকীয় খাঁচাটি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে, তখনই ফিলামেন্টটি ফেটে কোটি কোটি টন ওজনের প্লাজমা মহাকাশে ছুড়ে দেয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ

মহাকাশ আবহাওয়া বিজ্ঞানী তামিতা স্কোভ স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে একে একটি ‘টেক্সটবুক কোর ফিলামেন্ট’ বিস্ফোরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং আলোকচিত্রীদের সোমবার রাতের জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পদার্থবিদদের মতে, সূর্যের ওই অঞ্চলের চৌম্বকীয় রেখাগুলো একটি ‘এস’ আকৃতির মতো পেঁচিয়ে ছিল, ঠিক যেন একটি স্প্রিংকে তার ক্ষমতার চেয়েও বেশি দুমড়ে-মুচড়ে রাখা হয়েছে। ফলে সেখানে প্রচুর শক্তি জমা হয়। ৬ জুন গ্রিনিচ মান সময় দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে সেই পেঁচানো রেখাগুলো ছিঁড়ে গিয়ে এক্স-রে বিকিরণ তৈরি করে, যা পৃথিবীর রেডিও যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। একই সঙ্গে এটি সেকেন্ডে ১ হাজার ৪০০ কিমি বেগে প্লাজমার মেঘ ছুড়ে দেয়, যা রাতে আকাশে চোখ ধাঁধানো রঙের খেলা দেখাতে পারে।

পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র ও অরোরা

পৃথিবীর চারপাশের চৌম্বকীয় ক্ষেত্র একটি অবিরাম ঢাল হিসেবে কাজ করে। তবে ধেয়ে আসা প্লাজমার ভেতরের চৌম্বকীয় দিক যদি পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের ঠিক বিপরীত (দক্ষিণমুখী) হয়, তবেই পৃথিবীর সুরক্ষা ঢালটি ভেঙে যাবে এবং সৌর শক্তি ভেতরে প্রবেশ করবে। তখনই শুরু হবে মেরুজ্যোতি বা অরোরা।

ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের তীব্রতা ‘জি১’ থেকে ‘জি৫’ পর্যন্ত মাপা হয়। ২০২৪ সালের মে মাসে একটি চরম মাত্রার ‘জি৫’ ঝড় আমেরিকার পাওয়ার গ্রিড বিকল করেছিল এবং ভারতের আকাশেও অরোরা ফুটিয়ে তুলেছিল। এবারের ঝড়টি ‘জি৩’ মাত্রার হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে পরিস্থিতি প্রতিকূল হলে এটি সাময়িকভাবে ‘জি৪’ (তীব্র) রূপ নিতে পারে।

যেসব অঞ্চলে দেখা যেতে পারে অরোরা

এই মাত্রার ঝড়ে মেরুজ্যোতি মেরু অঞ্চল ছাড়িয়ে অনেক নিচে নেমে আসে। সোমবার রাতে আকাশ যদি অন্ধকার ও মেঘমুক্ত থাকে, তবে উত্তর ভারত, মধ্য ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের আকাশে সবুজ, বেগুনি ও লাল রঙের মেরুজ্যোতির অপরূপ দৃশ্য দেখা যেতে পারে।

ক্যানিবাল সিএমই’র সম্ভাবনা

বিজ্ঞানিরা আরও জানিয়েছেন, এর আগে গত ৩ জুনের দিকে সূর্যের অন্য একটি অংশ থেকে নির্গত ধীরগতির মেঘের সঙ্গে যদি এই তীব্র গতির নতুন মেঘটি মিশে যায়, তবে তা আরও শক্তিশালী ‘ক্যানিবাল সিএমই’ তৈরি করতে পারে। এর ফলে ঝড়ের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে। তবে আকাশের এই রঙের খেলা শুরু হওয়ার মাত্র ১৫ থেকে ৬০ মিনিট আগে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে রাতের আকাশ আসলেই রঙিন হচ্ছে কি না। ততক্ষণ পর্যন্ত বিজ্ঞানী ও অরোরা শিকারিরা কেবল অপেক্ষাই করছেন।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে