প্রথম আলো পত্রিকার ২ জুন ২০২৬ সংখ্যায় মুহাম্মদ জামালুদ্দীনের লেখা 'সৌরবিদ্যুৎ যেভাবে বাংলাদেশের জন্য বিরাট সম্ভাবনা' শীর্ষক নিবন্ধে সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক ভিজিটিং প্রফেসর ড. মো. শফিকুল ইসলাম এই প্রস্তাবকে 'অত্যন্ত অসংগতিপূর্ণ' ও 'প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টিকারী' বলে মনে করেন। তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়ায় খাতসংশ্লিষ্ট পর্যালোচনার ভিত্তিতে দ্বিমত ও বিকল্প প্রস্তাব পেশ করেছেন।
মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত নীতিগত অসংগতি
লেখক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পৃথক 'নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগ', নতুন করপোরেশন ও ইনস্টিটিউট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির নীতিনির্ধারণের মূল আইনি ম্যান্ডেট বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের (বিদ্যুৎ বিভাগ) কাছে রয়েছে। এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে বর্তমানে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকি করছে। হঠাৎ এই খাতকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিলে আন্তমন্ত্রণালয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সমন্বয়হীনতা তৈরি হবে, যা চলমান প্রোগ্রামকে বাধাগ্রস্ত করবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মূল কাজ মৌলিক বিজ্ঞানের তত্ত্বীয় ধারণাকে ব্যবহারিক প্রকৌশল রূপ দেওয়া। তাদের অধীনে থাকা প্রতিষ্ঠান যেমন বিসিএসআইআর ও পরমাণু শক্তি কমিশন গবেষণা ও উন্নয়নে নিয়োজিত। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন একটি প্রকৌশলবিদ্যা, বৈজ্ঞানিকবিদ্যা নয়। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার স্থাপন ও পরিচালনা প্রকৌশলজনিত কাজ, যা বিপিডিবি দীর্ঘকাল ধরে করে আসছে। বিপিডিবি শত শত যোগ্য প্রকৌশলী নিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অভিজ্ঞ, তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নেও তারা সক্ষম।
ভৌগোলিক বাস্তবতা ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা
লেখক ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের সৌরবিদ্যুতের সাফল্যের উদাহরণ দিলেও ভৌগোলিক পার্থক্য উপেক্ষা করেছেন। ভারত ও পাকিস্তানের বিশাল মরুভূমি ও অনুর্বর জমি রয়েছে, যেখানে তারা শত শত মেগাওয়াটের সোলার পার্ক স্থাপন করতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, যেখানে কৃষিজমি রক্ষা করা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। তাই এ দেশে বিশাল সোলার মেগা প্রকল্প স্থাপন ভৌগোলিকভাবে কঠিন। ভারত বা পাকিস্তানের মডেল হুবহু অনুসরণ করার যৌক্তিকতা নেই; তাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি পোর্টফোলিও বাংলাদেশের তুলনায় বহুগুণ বড়, যা আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোকে ন্যায্যতা দেয়। বাংলাদেশের ছোট পোর্টফোলিওর জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় বা করপোরেশন তৈরি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হবে।
পরিচালনা ব্যয় হ্রাস ও বিপিডিবির একক নেতৃত্ব
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌরবিদ্যুতের পোর্টফোলিও ভৌগোলিক কারণে খুব বড় হওয়ার সুযোগ নেই। তাই নতুন মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর তৈরি না করে বিদ্যুৎ বিভাগের অধীনে বিপিডিবির বিশেষায়িত নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা বেশি কার্যকর ও সাশ্রয়ী। বিপিডিবি ইতিমধ্যে সৌর ও বায়ুশক্তি প্রকল্প বাস্তবায়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করছে এবং বেসরকারি প্রকল্পে প্রযুক্তিগত ও নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে। প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস ও সুশাসন নিশ্চিত করতে স্রেডা বিলুপ্ত করে তার দায়িত্ব বিপিডিবির বিশেষায়িত বিভাগে ন্যস্ত করা যেতে পারে। অন্যদিকে স্রেডার নীতিমালা ও কৌশল প্রণয়নের ভূমিকা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে দেওয়া সমীচীন, কারণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন, ট্যারিফ নির্ধারণ ও তদারকি কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এতে সরকারের পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত একক চেইনে কাজ করার পরিধি বাড়বে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে।
অধ্যাপক শফিকুল ইসলামের মতে, দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করে রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও আমলাতন্ত্র জটিলতা বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। বিপিডিবি দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যুৎ খাত সামলাচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও গতিশীল করতে সংস্কার করা যেতে পারে। তাঁর সুস্পষ্ট প্রস্তাব: নবায়নযোগ্য জ্বালানি পোর্টফোলিও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের অধীনেই থাকা উচিত; স্রেডা বিলুপ্ত করে তার দায়িত্ব বিপিডিবির বিশেষায়িত বিভাগে দেওয়া উচিত এবং নীতিনির্ধারণী ও নিয়ন্ত্রক ভূমিকা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ওপর অর্পণ করা উচিত। এই পদ্ধতি আমলাতান্ত্রিক ব্যয় ন্যূনতম রেখে সুশাসন ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা সর্বোচ্চ করবে।
ড. মো. শফিকুল ইসলাম অধ্যাপক, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক ভিজিটিং প্রফেসর, নিউক্লিয়ার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, এমআইটি, যুক্তরাষ্ট্র।



