মে দিবসে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অর্থনৈতিক অবরোধ, নিউইয়র্কে বিক্ষোভে গ্রেপ্তার
মে দিবসে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অর্থনৈতিক অবরোধ, গ্রেপ্তার নিউইয়র্কে

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘মে ডে স্ট্রং’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ‘অর্থনৈতিক অবরোধ’ (ইকোনমিক ব্ল্যাকআউট) কর্মসূচি পালিত হয়েছে। দেশটির ৩ হাজার ৫০০টি স্থানে হাজারো মানুষ এ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। আয়োজকেরা এদিন ‘স্কুল, কাজ ও কেনাকাটা’ বর্জনের ডাক দেন। এর অংশ হিসেবে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সামনে ওয়াকআউট, পদযাত্রা, ব্লক পার্টি ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

নিউইয়র্কে উত্তাল বিক্ষোভ

নিউইয়র্ক নগরীর ম্যানহাটনে এই বিক্ষোভ সবচেয়ে উত্তাল রূপ নেয়। স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেলে সেখানে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘সানরাইজ মুভমেন্ট’-এর বিক্ষোভকারীরা নিজেদের শিকল দিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান ফটকের সঙ্গে বেঁধে ফেলেন। একই সঙ্গে ভবনের অন্যান্য বহির্গমন পথগুলো আটকে দিয়ে সেখানে অবস্থান নেন একদল বিক্ষোভকারী। পরে তাঁদের সঙ্গে প্রায় আরও ১০০ জন যোগ দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর প্রায় এক ঘণ্টা পর পুলিশ এসে তাঁদের গ্রেপ্তার করে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। এরপরও বিক্ষোভকারীদের একটি ছোট দল সেখানে অবস্থান করছিল। তাঁরা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ‘ধনী ব্যক্তিদের ওপর কর আরোপ করো’ স্লোগান দিতে থাকেন।

বড় শহরগুলোতে আন্দোলনের ঢেউ

শুধু নিউইয়র্কেই নয়, ওয়াশিংটন ডিসি, শিকাগো, লস অ্যাঞ্জেলেসসহ বড় শহরগুলোতেও এই আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা ধনকুবেরদের চেয়ে শ্রমিকদের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া, যুদ্ধ বন্ধ এবং অভিবাসন দপ্তরের (আইসিই) সঙ্গে চুক্তি বাতিলের দাবি জানান। ‘মে ডে স্ট্রং’ জোটের এই আন্দোলনে শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে যোগ দিয়েছে বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পোর্টল্যান্ড ও মিনিয়াপোলিসে গ্রেপ্তার

সানরাইজ মুভমেন্টের বিক্ষোভকারীরা দেশটির অন্যান্য শহরেও বিক্ষোভ করেছেন। পুলিশ তাঁদের অনেককে গ্রেপ্তার করেন। ওরেগন অঙ্গরাজ্যের পোর্টল্যান্ডে বিক্ষোভকারীরা হিলটন হোটেলের একটি লবি দখল করে নেন। সেখানে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের (ডিএইচএস) কর্মকর্তারাও অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসে একটি সেতু অবরোধ করার অভিযোগে ছয়জন সানরাইজ বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বিভিন্ন সংগঠনের ঐক্য

শ্রমিক আন্দোলনের বার্ষিক প্রতিবাদ কর্মসূচির দীর্ঘ ঐতিহ্য মেনে এ বছরও মে দিবস পালিত হয়েছে। তবে এবারের বিশেষত্ব হলো— আইসিই বিলুপ্তি, যুদ্ধ বন্ধ এবং ধনীদের ওপর কর আরোপের মতো দাবি আদায়ে বিভিন্ন সক্রিয় আন্দোলনগুলো এককাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। ‘মে ডে স্ট্রং’ জোটের অধীনে এই আন্দোলনে শামিল হয়েছে বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন, অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন, ডেমোক্রেটিক সোস্যালিস্টস অব আমেরিকার মতো রাজনৈতিক দল এবং ‘নো কিংস’ আন্দোলনের আয়োজকেরা।

নিউইয়র্কে পদযাত্রা

শুক্রবার ভোরে নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির প্রধান শাখা থেকে আমাজনের নিকটস্থ করপোরেট অফিস অভিমুখে একটি পদযাত্রা হয়েছে। অ্যামাজনের কর্মীদের সঙ্গে এই কর্মসূচিতে যোগ দেন টিমস্টার্স শ্রমিক ইউনিয়ন ও স্থানীয় রাজনীতিকরা। আইসিই এবং ডিএইচএসের সঙ্গে অ্যামাজনের সব চুক্তি বাতিলের দাবিতে এই পদযাত্রা বের করা হয়।

ওয়াশিংটন ডিসিতে বিক্ষোভ

রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে ‘ফ্রি ডিসি’ নামের একটি সংগঠনের বিক্ষোভকারীরা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। তাঁদের হাতে থাকা ব্যানারগুলোতে ‘ধনকুবেরদের চেয়ে শ্রমিক বড়’ এবং ‘যুদ্ধ নয়, স্বাস্থ্যসেবা চাই’ স্লোগানগুলো শোভা পাচ্ছিল।

শিকাগো ও মেম্ফিসে বিক্ষোভ

শিকাগোতে সার্ভিস এমপ্লয়িজ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়নের (এসইআইইউ) স্বাস্থ্যকর্মীরা অ্যামাজনের একটি গুদাম অভিমুখে পদযাত্রা করেছেন। এ সময় তাঁদের হাতে অ্যামাজন প্রধান জেফ বেজোসের মাথার একটি বিশালাকার প্রতিকৃতি দেখা যায়। অন্যদিকে, টেনেসির মেম্ফিসে একদল বিক্ষোভকারী রাস্তায় শুয়ে ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান এক্সএআইয়ের তথ্যকেন্দ্রের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেন।

সারা দেশে বিক্ষোভের ছবি

বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মী, মারিয়াচি ব্যান্ড, ছাত্র, শিক্ষক ও রাজনীতিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মিছিলে উত্তাল হয়ে ওঠে মধ্য-পশ্চিম থেকে পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল। লস অ্যাঞ্জেলেস, ওয়াশিংটন ডিসি, উইসকনসিনের ম্যাডিসন এবং নর্থ ক্যারোলাইনায় মিছিলে জনসমুদ্রের ছবি ও ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

আন্দোলনের ধারাবাহিকতা

শুক্রবার এই অর্থনৈতিক ব্ল্যাকআউট কর্মসূচিটি মূলত মিনেসোটার গত জানুয়ারির একটি সমন্বিত আন্দোলনেরই ধারাবাহিকতা। সে সময় কেন্দ্রীয় অভিবাসন কর্মকর্তাদের ধরপাকড় অভিযানের প্রতিবাদে টুইন সিটিজের হাজার হাজার বাসিন্দা স্কুল ও কাজ বর্জন করে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। এই আন্দোলনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। মূলত আইসিইর বিরুদ্ধে কয়েক মাস ধরে চলা তাঁদের প্রচারণারই ধারাবাহিকতা ছিল এই কর্মসূচি।

নো কিংস আন্দোলনের মূল্যায়ন

নো কিংস আন্দোলনের নেপথ্যে থাকা প্রধান সংগঠনগুলোর একটি হলো ইন্ডিভিজিবল। এই সংগঠনের নেত্রী লিয়া গ্রিনবার্গ অর্থনৈতিক ব্ল্যাকআউট কর্মসূচিকে তাদের আন্দোলনের একটি বড় ‘শক্তি পরীক্ষা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষকে তাঁদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে— সেটি কর্মক্ষেত্র হোক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক বা স্থানীয় কোনো সংগঠক হিসেবে— নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য একধাপ এগিয়ে আসতে বলছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বৃহত্তর অসহযোগ আন্দোলনের শক্তি সঞ্চয়ের পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ

উত্তর ক্যারোলাইনার অন্তত ১৫টি স্কুল জনশিক্ষার তহবিলের দাবিতে ‘কিডস ওভার করপোরেশনস’ শীর্ষক এক বিশাল র‍্যালিতে অংশ নিতে শিক্ষকদের জন্য ছুটি ঘোষণা করে। এদিকে শিকাগোতে মে দিবসকে ‘নাগরিক সচেতনতা দিবস’ হিসেবে পালন করার দাবি আদায়ে সফল হয়েছে স্থানীয় শিক্ষক ইউনিয়ন। অন্যদিকে উইসকনসিনের ম্যাডিসন ও মিলওয়াকিতেও এদিন স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। সেখানে শিক্ষকদের বড় ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে।

শিক্ষক নেতার বক্তব্য

শিকাগো টিচার্স ইউনিয়ন ও ইলিনয় ফেডারেশন অব টিচার্সের সভাপতি স্ট্যাসি ডেভিস গেটস চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, ‘শিক্ষক হিসেবে আমরা যেসব পরিবারের তরুণ প্রজন্মের জন্য কাজ করি, তাঁদের প্রতি আমাদের এক ধরনের দায়বদ্ধতা রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, আমরা মানুষকে কেবল জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সংকটের সঙ্গেই নয়, বরং বর্তমান সময়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে এবং এর ফলে তরুণ সমাজের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, সেই সংকটের সঙ্গেও পরিচিত করতে চাই।’

ছাত্র সংগঠকের বক্তব্য

ইন্ডিয়ানার ওয়েস্ট লাফায়েটের পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং সানরাইজ মুভমেন্টের স্থানীয় সংগঠক সংশয় কুকুলা ছাত্র, শিক্ষক ও শ্রমিকদের নিয়ে একটি গণ-ওয়াকআউট কর্মসূচির সমন্বয় করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ধনিক শ্রেণিকে একটি বার্তা দিতে এই সম্মিলিত পদক্ষেপ নিয়েছি। সেটি হলো—আমাদের শ্রম, আমাদের খরচ আর আমাদের অংশগ্রহণই এই গোটা ব্যবস্থাকে সচল রাখে। আমরা যদি কাজ না করি, তবে তাদের মুনাফাও থাকবে না।’

ধর্মঘট

অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ে অনেক শ্রমিক ইউনিয়নও ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। নিউ অরলিন্সের ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের নার্সরা বলেছেন, একটি ন্যায্য চুক্তির দাবিতে শুক্রবার থেকে তাঁরা পাঁচ দিনের ধর্মঘট শুরু করছেন।