প্রমাণ চাওয়ায় ক্ষুব্ধ ট্রাম্প, সাক্ষাৎকার ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন
প্রমাণ চাওয়ায় ক্ষুব্ধ ট্রাম্প, সাক্ষাৎকার ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এনবিসি নিউজের একটি সাক্ষাৎকার মাঝপথেই বর্জন করে বেরিয়ে গেছেন। 'আজ এখানেই শেষ করা যাক। কারণ অনেক হয়েছে। ধন্যবাদ, ডার্লিং'—এই কথাগুলো বলেই তিনি সঞ্চালক ক্রিস্টেন ওয়েলকারের সঙ্গে চলা উত্তপ্ত বাদানুবাদের পর স্টুডিও ছেড়ে চলে যান।

বাদানুবাদের সূত্রপাত

২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ এবং সঞ্চালকের বারবার প্রমাণ চাওয়ার জেরে এই নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। এনবিসির 'মিট দ্য প্রেস' অনুষ্ঠানের জন্য নেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নির্বাচন ব্যবস্থা কারচুপির শিকার বলে দাবি করছিলেন। ওয়েলকার যখন বারবার প্রমাণ চান, তখন আলোচনা অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে।

ইরান প্রসঙ্গ ও অ্যান্টি-উইপোনাইজেশন তহবিল

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে কথা বলার পর এই বাদানুবাদের সূত্রপাত হয়। ওয়েলকার ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ১৮০ কোটি ডলারের অ্যান্টি-উইপোনাইজেশন ইনিশিয়েটিভ সম্পর্কে জানতে চান। এই তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল পূর্ববর্তী প্রশাসনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ট্রাম্প সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, 'এই উইপোনাইজেশন ফান্ডের মাধ্যমে একদল নিরপেক্ষ ও বুদ্ধিমান মানুষকে দায়িত্ব দেওয়া হতো, যাদের যে কেউ বেছে নিতে পারত। তারা প্রতিটি মামলা বা ঘটনা আলাদাভাবে খতিয়ে দেখত।' তিনি আরও বলেন, 'এখন আমি জানি না এই ফান্ডের কী হবে। তবে আইডিয়াটা আমার দারুণ পছন্দ। কারণ আপনাদের মতো 'ফেক ডার্টি প্রেস', এই 'ক্রুকেড প্রেস' (দুর্নীতিবাজ গণমাধ্যম) এবং বাইডেনের মতো বোকা মানুষ, যার চারপাশে কী ঘটছে তা বোঝার মতো বুদ্ধি নেই, তাদের চারপাশের মানুষগুলো ওভালের অফিসের সেই সুন্দর রেজলুট ডেস্কের চারপাশে বসে মানুষের জীবন ধ্বংস করেছে। তারা এমন সব মানুষকে জেলে পাঠিয়েছে যারা কোনও অপরাধই করেনি।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রমাণের প্রশ্নে তীব্র বিতর্ক

ওয়েলকার তাৎক্ষণিকভাবে মনে করিয়ে দেন যে, ট্রাম্পের এসব অভিযোগের পেছনে কোনও বাস্তব প্রমাণ নেই। এ কথা শুনে ট্রাম্প আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং বলেন, 'আমার কথা শুনুন: এর পেছনে ব্যাপক প্রমাণ রয়েছে। প্রমাণ ছাড়া আর কিছুই নেই। ওই নির্বাচনটি কারচুপির ছিল। ওটি একটি নোংরা নির্বাচন ছিল এবং ঠিক একই ঘটনা এখন আবার ক্যালিফোর্নিয়াতেও ঘটছে।'

ওয়েলকার যুক্তি দিয়ে বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচনের দিন পর্যন্ত ডাকযোগে পাঠানো ব্যালটগুলো পরেও গ্রহণ করা হয় এবং তা গণনা করা হয়। এই কারণেই সাধারণত সেখানে ভোট গণনায় কিছুটা বেশি সময় লাগে। কিন্তু ট্রাম্প এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, 'আপনি জানেন তারা কেন এমনটা করছে? কারণ তারা নির্বাচনে জালিয়াতি করছে।'

ওয়েলকার যখন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আছে কি না জানতে চান, তখন ট্রাম্প উত্তর দেন, 'আমাকে শুধু চোখ কান খোলা রাখতে হবে। আমি শুধু দেখি এবং মানুষের কথা শুনি, দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী ঘটে।'

গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ

আলোচনা যত এগোচ্ছিল, দুজনেই বারবার একই প্রশ্নে ফিরে আসছিলেন—ট্রাম্পের গুরুতর অভিযোগগুলোর পেছনে প্রমাণ আছে কি না। একপর্যায়ে ট্রাম্প সঞ্চালককে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে প্রশ্ন করেন, তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচন পদ্ধতিকে সঠিক মনে করেন কি না। ট্রাম্প প্রশ্ন করেন, 'আপনার কি মনে হয় এটি কোনও সঠিক পদ্ধতি যে ভোট নেওয়ার কয়েক দিন পরও তারা বিজয়ী নির্ধারণের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারে না?' জবাবে ওয়েলকার বলেন যে, নির্বাচন কর্মকর্তারাও ভোট গণনার ধীরগতির কথা স্বীকার করেছেন।

এরপর ট্রাম্প সরাসরি গণমাধ্যমকে আক্রমণ করা শুরু করেন। তিনি বলেন, 'না, তারা দুর্নীতিবাজ। তারা ঠিক আপনার মতোই দুর্নীতিবাজ। আপনার প্রেস দুর্নীতিবাজ এবং মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানটিও দুর্নীতিবাজ।' ওয়েলকার পাল্টা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে বলেন, 'ন্যায়সঙ্গতভাবে বলতে গেলে, আমি মোটেও দুর্নীতিবাজ নই, তবে চলুন আমরা...' কিন্তু তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই ট্রাম্প মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলেন, 'তাই নাকি? আচ্ছা, আপনি তাহলে তাদের হাতের পুতুল হয়ে খেলছেন। আপনি হয় দুর্নীতিবাজ, না হয় অত্যন্ত বোকা।'

সাক্ষাৎকারের নাটকীয় সমাপ্তি

এরপরও আরও কয়েক মিনিট আলোচনা চলে, যেখানে ট্রাম্প আমেরিকার বড় বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোর বিরুদ্ধে একপেশে প্রচার এবং নির্বাচন নিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন। একপর্যায়ে তিনি মার্কিন নির্বাচন ব্যবস্থার সমালোচনা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি 'তৃতীয় বিশ্বের দেশ'-এর সঙ্গে তুলনা করেন।

ট্রাম্প ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, 'আপনাদের নির্বাচন ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত, আপনিও দুর্নীতিবাজ এবং মিট দ্য প্রেস-ও দুর্নীতিবাজ। একই অবস্থা এবিসি, সিবিএস ও সিএনএনেরও। আপনারা সবাই একপেশে ও দুর্নীতিগ্রস্ত নেটওয়ার্ক।' এর কিছু মুহূর্ত পরেই তিনি ঘোষণা করেন যে তিনি আর সাক্ষাৎকার দেবেন না। 'আজ এখানেই শেষ করা যাক। কারণ অনেক হয়েছে। ধন্যবাদ, ডার্লিং'—এই কথা বলতে বলতেই তিনি নিজের গায়ের মাইক্রোফোনটি খুলে ফেলেন।

ওয়েলকার তাকে থেকে যাওয়ার এবং সাক্ষাৎকারটি শেষ করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, তিনি এই সাক্ষাৎকারের জন্য বিশেষ অনুরোধে উইসকনসিন থেকে এসেছেন। জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি ইতোমধ্যে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, 'আমি আপনাকে অনেক সময় দিয়েছি। আপনাদের উচিত নিজেদের গণমাধ্যমকে সংশোধন করা। কারণ মনে রাখবেন, একটি অসৎ গণমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে কোনও দেশ কখনও মহান হতে পারে না।' এরপরই তিনি আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান এবং সাক্ষাৎকার কক্ষ ত্যাগ করেন, যার ফলে একটি বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকারের অত্যন্ত নাটকীয় ও আকস্মিক সমাপ্তি ঘটে।