লেবাননে যুদ্ধবিরতির মধ্যেই পাকিস্তানে আলাদাভাবে বৈঠক করলেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা
লেবাননে গভীর মতপার্থক্য ও অব্যাহত লড়াইয়ের কারণে ভঙ্গুর হয়ে পড়া যুদ্ধবিরতির মধ্যেই শনিবার ইসলামাবাদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, এই আলোচনা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করলেও দুই পক্ষের অনড় অবস্থান আর পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি সংশয় জিইয়ে রেখেছে।
পৃথক বৈঠক ও সরাসরি আলোচনার অনুপস্থিতি
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও ইরানি সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বে অপর একটি দল প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তবে বিকেল পর্যন্ত ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে কোনও সরাসরি বৈঠকের ঘোষণা আসেনি, যা শান্তি প্রক্রিয়ার জটিলতা নির্দেশ করে।
ইসরায়েলি হামলা ও ইরানের শর্ত
একদিকে যখন আলোচনার তোড়জোড় চলছে, অন্যদিকে ইসরায়েল লেবাননে তাদের বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইরান স্পষ্ট শর্ত দিয়েছে যে, লেবাননে লড়াই বন্ধ হলেই কেবল তারা পূর্ণাঙ্গ আলোচনায় বসবে। লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, শনিবারও ইসরায়েলি হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন, যা অঞ্চলের উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলছে।
যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি ও মানবিক সংকট
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা:
- ইরানে ৩ হাজার জন
- লেবাননে ১ হাজার ৯৫৩ জন
- ইসরায়েলে ২৩ জন
- পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে এক ডজনের বেশি মানুষ
এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে পারস্য উপসাগর কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যার ফলে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং অঞ্চলের অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া ও হুঁশিয়ারি
তেহরানের বাসিন্দা শাহাব বানিতাবা মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করে বলেন, "যদি আমরা কোনও সুনির্দিষ্ট ও চূড়ান্ত ফলাফল পাইও, তবুও চুক্তিটি ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে।" আলোচনা শুরুর আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি দাবি করেছেন যে আলোচনার টেবিলে ইরানি কর্মকর্তাদের হাতে কোনও ‘কার্ড’ নেই এবং হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে ইরান ‘চাঁদাবাজি’ করছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, "তারা যদি আমাদের সঙ্গে চালাকি করার চেষ্টা করে, তবে দেখবে এই আলোচনার দলটি মোটেও নমনীয় নয়।" অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, তারা ‘গভীর অবিশ্বাস’ নিয়ে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন এবং ইরান আবারও আক্রান্ত হলে পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত।
ইসলামাবাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ আলোচনা
উচ্চপর্যায়ের এই আলোচনাকে কেন্দ্র করে শনিবার ইসলামাবাদ ছিল জনশূন্য। নিরাপত্তা বাহিনী রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেওয়ায় এবং বাসিন্দাদের ঘরের ভেতর থাকার নির্দেশ দেওয়ায় পাকিস্তানের ব্যস্ত রাজধানীটি অনেকটা কারফিউর কবলে থাকা শহরের মতো রূপ নিয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষ আলোচনার মধ্যেই লেবাননের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরু হতে পারে।
হিজবুল্লাহ ইস্যু ও যুদ্ধের কৌশলগত দিক
ইসরায়েল চায় লেবানন সরকার যেন হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের দায়িত্ব নেয়, তবে গত কয়েক দশক ধরে টিকে থাকা এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্র কেড়ে নেওয়া লেবাননের সেনাবাহিনীর পক্ষে কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি মানেই হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই বন্ধ করা নয়, যা পুরো আলোচনা প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। উল্লেখ্য, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার দিনই বৈরুতে ইসরায়েলি হামলায় ৩০০ জনের বেশি নিহত হন, যা গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন ছিল।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ ও অর্থনৈতিক প্রভাব
যুদ্ধের কৌশলগত তুরুপের তাস হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে, এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম শুক্রবার ৯৭ ডলারে নেমেছে, যদিও তা যুদ্ধ শুরুর তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। আগে যেখানে প্রতিদিন ১০০টির বেশি জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করত, সেখানে যুদ্ধবিরতি শুরুর পর মাত্র ১২টি জাহাজ পার হয়েছে। ইরান এখন শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ‘মাসুল’ আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ওমানসহ অধিকাংশ দেশ এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।



