৪০ দিনের যুদ্ধের পর ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র
৪০ দিনের ভয়াবহ যুদ্ধের আপাত সমাপ্তি ঘটলেও ইসরাইল এবং লেবাননের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা এখনো চলমান। এই সংঘাতে কে জিতেছে বা হেরেছে তার স্পষ্ট উত্তর না মিললেও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা যে অকল্পনীয়, তা ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে। এই ক্ষতি আরো বাড়বে কিনা, তার উত্তর মিলতে পারে আজ থেকে পাকিস্তানে শুরু হওয়া সমঝোতা বৈঠক থেকে।
ইরানের উপর মার্কিন-ইসরাইলি হামলা: প্রাণহানি ও অবকাঠামো ধ্বংস
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরু হয়। এরপর থেকেই পাল্টাপাল্টি আক্রমণের এক দীর্ঘ অধ্যায় শুরু হয়, যেখানে কেউ কারো প্রতি ছাড় দেয়নি। অবশেষে গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরই ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র সামনে আসতে শুরু করে।
ইরানের ফরেনসিক মেডিসিন সংস্থার প্রধান আব্বাস মাসজেদি আরানির বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) এর তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ এপ্রিল পর্যন্ত যুদ্ধে অন্তত ২৫৪ জন শিশুসহ ১ হাজার ৭০১ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, শীর্ষ বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তারাও নিহত হয়েছেন।
ইরানের বেসামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আল-আরাবিয়ার প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৪০ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকার সমতুল্য। ইরানের রেডক্রস সোসাইটির প্রধান পিরহোসেন কোলিভান্ডের তথ্যমতে, যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ২৫ হাজার ৬৩০টি বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ আবাসিক বাড়ি রয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামরিক স্থাপনার উপর আঘাত
ইসরাইল ও মার্কিন হামলায় ২৩ হাজার ৫০০টি বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং ৩৩৯টি হাসপাতাল, ফার্মেসি ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩২টি বিশ্ববিদ্যালয় ও ৮৫৭টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় ইরানের চারটি প্রধান ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎপাদন কেন্দ্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ২৯টি মিসাইল উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং ৫টি জ্বালানি সংরক্ষণাগারেও হামলা চালানো হয়েছে।
অনেক ইরানি নাগরিক তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছেন এবং দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিমানবন্দর ও সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক ক্ষতি
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সাতটি চালকসহ যুদ্ধবিমান এবং ২০টির বেশি এয়ারক্র্যাফট হারিয়েছে। নিজেদের ভুলেও কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। গত ২ মার্চ কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভুলে ছোড়া ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে ৩টি ম্যাকডোনেল ডগলাস এফ-১৫ ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়, যার প্রতিটির দাম প্রায় ৯৭ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১১ কোটি টাকা)।
গত ২৭ মার্চ সৌদি আরবে ইরানি হামলায় একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ই-৩ সেন্ট্রি আওয়াকস বিমান ধ্বংস হয়, যার দাম অন্তত ৩০০ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় তিন হাজার ৬শ’ কোটি টাকার বেশি)। এরপর গত এপ্রিল আরো একটি এফ-১৫ ই এবং দুটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট ধ্বংস হয় ইরানের আঘাতে। গত ১৯ মার্চ ইরানের ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়, যার তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ৪৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি।
গত ৫ এপ্রিল ইরানে পাইলটকে উদ্ধার করতে গিয়ে দুটি লকহিড সি-১৩০ হারকিউলিস বিমান হারায় যুক্তরাষ্ট্র, যার প্রতিটির মূল্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩ কোটি টাকার বেশি)। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, ১৯ মার্চের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১২টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ধ্বংস হয়েছে, যার মধ্যে ৯টিকে সরাসরি গুলি করে নামিয়েছে ইরান। একটি ড্রোনের দাম প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় চারশ’ কোটি টাকা)।
বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালীতে নজরদারি করার সময় যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ-৪সি ট্রাইটন ড্রোন হারিয়ে গেছে, যার দাম প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় দুই হাজার চারশ’ কোটি টাকার বেশি)। সব মিলিয়ে যুদ্ধবিমানসহ অন্যান্য বিমান এবং ড্রোন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই বিপুল ক্ষতির ধাক্কা সামলাতেই শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। এছাড়া ১৪ জন মার্কিন সেনা নিহত ও অনেকে আহত হয়েছে।
অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি ও সমঝোতার আশা
গত ২১ মার্চ বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় ক্ষতির পরিমাণ ৮০০ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা)। গত ৩১ মার্চ আল জাজিরা জাতিসংঘের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, ইরানের একমাসের হামলায় আরব দেশগুলোর ক্ষতির পরিমাণ ১৯৪ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা)। মধ্যপ্রাচ্যেও অনেকের প্রাণ গেছে।
ইসরাইলের অর্থমন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৪০ দিনের যুদ্ধে তাদের ক্ষতি হয়েছে ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় সোয়া দুই লাখ কোটি টাকার বেশি)। এখন সকলের নজর পাকিস্তানে শুরু হওয়া সমঝোতা বৈঠকের দিকে, যা এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



