ট্রাম্পের ইরান বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংসের হুমকি যুদ্ধাপরাধ হতে পারে: বিশেষজ্ঞরা
ট্রাম্পের ইরান হুমকি যুদ্ধাপরাধ হতে পারে

ট্রাম্পের ইরান বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংসের হুমকি যুদ্ধাপরাধ হতে পারে: বিশেষজ্ঞরা

ইরানের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সেতু উড়িয়ে দেওয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সামরিক আইন বিশেষজ্ঞরা। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের দেওয়া এই নজিরবিহীন হুমকির পর বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে।

যুদ্ধাপরাধ নির্ধারণের মানদণ্ড

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও স্থাপনা সামরিক লক্ষ্যবস্তু কি না, হামলাটি সংখ্যানুপাতিক কি না এবং বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে কি না, এই বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে যুদ্ধাপরাধ নির্ধারিত হয়। ট্রাম্পের হুমকি এতটাই ব্যাপক যে, এতে বেসামরিক মানুষের জানমালের নিরাপত্তার বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে বলে মনে করছেন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্য, জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও আইনবিদরা।

জাতিসংঘের কঠোর সতর্কতা

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক সোমবার সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে এ ধরনের অবকাঠামোতে হামলা নিষিদ্ধ। তিনি বলেন, ‘কোনও নির্দিষ্ট বেসামরিক অবকাঠামো যদি সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিতও হয়, তবুও সেখানে হামলা চালানো যাবে না যদি তাতে বেসামরিক মানুষের অত্যধিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি থাকে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বেসামরিক জনগণের মারাত্মক ঝুঁকি

মার্কিন বিমানবাহিনীর সাবেক জাজ অ্যাডভোকেট জেনারেল এবং সাউথওয়েস্টার্ন ল স্কুলের অধ্যাপক রাচেল ভ্যানল্যান্ডিংহাম বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করলে হাসপাতাল ও পানি শোধন প্ল্যান্টগুলো অচল হয়ে পড়বে, ফলে অসংখ্য বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হতে পারে। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প যা বলছেন তার অর্থ হলো, আমরা নিখুঁত হামলার তোয়াক্কা করি না, বেসামরিক মানুষের ওপর প্রভাবের পরোয়া করি না, আমরা কেবল ইরানের সব বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস করে দেব।’

ট্রাম্পের নির্বিকার অবস্থান

তবে ট্রাম্প এ বিষয়ে নির্বিকার। সোমবার তিনি বলেন, ধ্বংসযজ্ঞের হুমকি দিয়ে তিনি যুদ্ধাপরাধ করছেন কি না, তা নিয়ে তিনি ‘আদৌ’ চিন্তিত নন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, ইরানের প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘জ্বলবে, বিস্ফোরিত হবে এবং আর কখনোই ব্যবহারের যোগ্য থাকবে না।’

হোয়াইট হাউসের বিতর্কিত বক্তব্য

বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি এক ইমেইলে বলেন, ‘ইরানের সাধারণ মানুষ বোমার শব্দকে স্বাগত জানাচ্ছে, কারণ এর অর্থ হলো তাদের শোষকরা হারছে।’ তিনি দাবি করেন, ইরান সরকার গত ৪৭ বছর ধরে নিজ নাগরিকদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে এবং জানুয়ারিতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে।

আইনগত বিশ্লেষণ ও বিকল্প প্রস্তাব

ইউএস নেভাল ওয়ার কলেজের ইমেরিটাস অধ্যাপক মাইকেল স্মিট বলেন, ‘এটি স্পষ্টতই একটি বেআইনি কাজের হুমকি।’ তিনি জানান, কোনও বিদ্যুৎকেন্দ্র যদি বেসামরিক মানুষের পাশাপাশি সামরিক ঘাঁটিতে বিদ্যুৎ দেয়, তবেই সেখানে হামলা করা সম্ভব। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও ক্ষতি যেন অসামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হয়। তিনি পরামর্শ দেন, পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস না করে কেবল নির্দিষ্ট সাবস্টেশন বা সঞ্চালন লাইনে হামলা চালানো যেতে পারে।

রাজনৈতিক বিভাজন ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব

অন্যদিকে রিপাবলিকান সিনেটর জনি এরনস্ট ট্রাম্পের পক্ষ নিয়ে বলেছেন, এটি কোনোভাবেই যুদ্ধাপরাধ নয়। এটি একটি চলমান অভিযান এবং ট্রাম্প কেবল তার প্রভাব খাটাচ্ছেন। তবে ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন একে ‘আদর্শ যুদ্ধাপরাধের নমুনা’ বলে অভিহিত করেছেন। অধ্যাপক ভ্যানল্যান্ডিংহাম সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের হামলা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই উল্টো ফল বয়ে আনবে। ইরাক, আফগানিস্তান বা ভিয়েতনামের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘আইনগতভাবে বৈধ অনেক কিছুই শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। ট্রাম্পের এই বাগাড়ম্বর সাধারণ ইরানিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে, যা ইরান সরকারকে তাদের পক্ষে জনমত গঠনে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াতে প্রোপাগান্ডা হিসেবে সাহায্য করবে।’

অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ডেডলাইন

উল্লেখ্য, পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়। ইরানের অবরোধের কারণে এই পথ বর্তমানে বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার রাতের মধ্যে এই পথ খুলে দেওয়ার জন্য ইরানকে ডেডলাইন দিয়েছেন ট্রাম্প।