ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা: ধ্বংসস্তূপ সরিয়েই পুনরায় হামলা চালাচ্ছে তেহরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দফায় দফায় বিমান হামলার মুখেও ইরান মাটির নিচে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র বাঙ্কার ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্র (সাইলো) কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সচল করে তুলতে সক্ষম হচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দাদের মূল্যায়নে উঠে এসেছে, ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ভূগর্ভস্থ এসব স্থাপনা দ্রুত পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করার ক্ষেত্রে তেহরানের অভাবনীয় সক্ষমতা। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের যে লক্ষ্য ওয়াশিংটন নির্ধারণ করেছিল, তা কতটা অর্জিত হয়েছে—সে বিষয়ে খোদ মার্কিন গোয়েন্দাদের মধ্যেই সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
গোয়েন্দা মূল্যায়নে সক্ষমতার চিত্র
মার্কিন গোয়েন্দাদের মতে, তেহরান এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ভ্রাম্যমাণ উৎক্ষেপণ যন্ত্র (মোবাইল লঞ্চার) সংরক্ষণে সক্ষম হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিপুল সংখ্যক নকল লঞ্চার মোতায়েন করায় যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত হতে পারছে না—আসলে কতগুলো প্রকৃত লঞ্চার ধ্বংস হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার বা সাইলো বাইরে থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মনে হলেও, ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সেখান থেকে দ্রুত লঞ্চার উদ্ধার করে পুনরায় হামলা চালানো হচ্ছে।
একজন জ্যেষ্ঠ পশ্চিমা কর্মকর্তার মতে, ইরান বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ৩০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৫০ থেকে ১০০টি আত্মঘাতী ড্রোন নিক্ষেপ করছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বা শেষ হওয়ার পরও আঞ্চলিক হুমকি বজায় রাখতে তেহরান তাদের উৎক্ষেপণ সক্ষমতা যতটা সম্ভব সংরক্ষণে রাখার কৌশল নিয়েছে।
মার্কিন প্রতিবেদন ও বিতর্ক
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা হামলার পরও ইরানের প্রায় অর্ধেক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার এখনও অক্ষত রয়েছে। তবে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের হতাশাজনক চিত্রের বিপরীতে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগন বেশ আশাবাদী মনোভাব দেখাচ্ছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি জানিয়েছেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে।
তিনি দাবি করেছেন, ইরানের নৌবাহিনী পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে এবং দুই-তৃতীয়াংশ উৎপাদন কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে। পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্যকে ‘সম্পূর্ণ ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, ইরানকে নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্যমাত্রা সময়ের আগেই অর্জিত হতে যাচ্ছে।
ইসরায়েলের দাবি ও বাস্তবতা
গত মার্চ মাসে ইসরায়েল দাবি করেছিল, তারা ইরানের ৪৭০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ ধ্বংস বা অকেজো করতে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান ইসরায়েল লক্ষ্য করে ৫০০ এর বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে, জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে আসা এসব ক্ষেপণাস্ত্রের ৯২ শতাংশ তারা আকাশে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।
তবে এর মধ্যেও অন্তত ১২টি শক্তিশালী প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের জনবহুল এলাকায় আঘাত হানে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে। এছাড়া ৩০টির বেশি ঘটনায় ক্লাস্টার বোমা বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্র জনপদে আঘাত হেনেছে, যার ফলে অন্তত ২০০টি আলাদা স্থানে বিস্ফোরণ ও ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা গেছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিয়ে দেশটির বর্তমান সরকারকে উৎখাত করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, যা এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল



