ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ভূপাতিত একটি মার্কিন এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের পাইলটকে উদ্ধার করতে গিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী নিজেদের দুটি পরিবহন বিমান ধ্বংস করেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার (৫ এপ্রিল ২০২৬) ভোরে এই উদ্ধার অভিযান চালানো হয়, যা চলমান পাঁচ সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধের সবচেয়ে বিশৃঙ্খল ৪৮ ঘণ্টার একটি অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ
মার্কিন বিশেষ বাহিনী কর্নেল পদমর্যাদার এক অস্ত্র ব্যবস্থা কর্মকর্তাকে উদ্ধার করেছে, যিনি বিমান থেকে ইজেকশনের সময় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে পাহাড়ে ৩৬ ঘণ্টারও বেশি সময় লুকিয়ে ছিলেন। তার কাছে আত্মরক্ষার জন্য কেবল একটি হ্যান্ডগান ছিল, যদিও উদ্ধারকারী দলের সাথে যোগাযোগের জন্য একটি বিকন এবং এনক্রিপ্টেড ডিভাইসও ছিল। উদ্ধারের পর তাকে চিকিৎসার জন্য কুয়েতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মার্কিন বিমান ধ্বংসের সিদ্ধান্ত
নিউ ইয়র্ক টাইমস এই ঘটনাকে ‘একটি চূড়ান্ত নাটকীয় মোড়’ বলে বর্ণনা করেছে। কমান্ডো এবং উদ্ধারকৃত কর্মকর্তাকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য নির্ধারিত দুটি পরিবহন বিমান ইরানের অভ্যন্তরে একটি দুর্গম ঘাঁটিতে অকেজো হয়ে পড়ে। স্পর্শকাতর সামরিক সরঞ্জাম সংবলিত বিমানগুলো ইরানি বাহিনীর হাতে পড়ার ঝুঁকি এড়াতে কমান্ডোরা সেগুলো ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। এরপর সমস্ত মার্কিন সদস্যকে ফিরিয়ে নিতে আরও তিনটি বিকল্প বিমান পাঠানো হয়।
ইরানের দাবি ও সংঘাতের পরিস্থিতি
এদিকে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং পুলিশ পৃথকভাবে দাবি করেছে যে তারা ইসফাহানের কাছে একটি মার্কিন সি-১৩০ সহায়তা বিমান ভূপাতিত করেছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির মতে, বিমানটিকে একটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। পেন্টাগন বা সেন্ট্রাল কমান্ড এখনো এই দাবি নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি, তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান একাধিক মার্কিন বিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে, যার অনেকগুলো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সশস্ত্র সংঘর্ষ ও প্রতিক্রিয়া
সিবিএস নিউজ নিশ্চিত করেছে যে উদ্ধার অভিযানের সময় মার্কিন কমান্ডোরা ইরানি সেনাদের সাথে সরাসরি বন্দুকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং ইরানি কনভয়ের উপর মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে বোমা ও গুলি বর্ষণ করা হয়। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল রিপোর্ট করেছে যে এই মিশনে ‘ইরানি স্থল বাহিনীর সঙ্গে বড় কোনো বন্দুকযুদ্ধ হয়নি’, যা অন্যান্য মিডিয়া বর্ণনার সাথে কিছুটা ভিন্ন। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধারকারী দলের কোনো সদস্য হতাহত হননি, কিন্তু স্থানীয় ভিডিওতে আইআরজিসি ও বাসিজ সদস্যদের আহত ও মৃত দেখা গেছে।
স্থানীয় প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক প্রভাব
নিউ ইয়র্ক টাইমসের গবেষণা অনুযায়ী, এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানটি ইরানের এমন একটি অঞ্চলে ভূপাতিত হয়েছিল যেখানে ‘ইরান সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত’ রয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ভূপাতিত কর্মকর্তা স্থানীয় বেসামরিক নাগরিকদের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছেন। এটি ইরান সরকারের আহ্বানের বিপরীত, যেখানে স্থানীয়দের তাকে খুঁজে বের করতে উৎসাহিত করতে ৬০ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। সশস্ত্র উপজাতীয় ব্যক্তি ও গ্রামবাসীরা ব্যক্তিগত অস্ত্র নিয়ে পাহাড়ে তল্লাশি চালিয়েছিল।
শত্রু ভূখণ্ডে নিজেদের বিমান ধ্বংসের এই ঘটনা একটি উল্লেখযোগ্য অপারেশনাল জটিলতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ইরানি ভূখণ্ডের গভীরে দীর্ঘস্থায়ী অভিযানের ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জকে স্পষ্ট করে তোলে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক স্তরে উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে এবং যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।



