ইরানের পালটা হামলায় ইসরাইলিরা নাজেহাল হয়ে পড়েছে। মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ আগ্রাসনের জবাবে ইরানের প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইসরাইলিদের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে হাজার হাজার ইসরাইলি এখন জন্মভূমি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। একইসঙ্গে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভে ফুঁসে উঠছে তারা।
ইরানের হামলায় ইসরাইলিদের নাজেহাল অবস্থা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ইরানে আগ্রাসন শুরু করে ইসরাইল। এই যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ সরকার ও সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ নেতারা নিহত হয়েছেন। দুই হাজারের কাছাকাছি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু ইরানিরা হাল ছাড়েনি। বরং সাধারণ নাগরিকরা বিদ্রোহী হয়ে উঠছে।
অপরদিকে ইসরাইলের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ইরানের শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য আগ্রাসন শুরু করলেও সরকারবিরোধী আন্দোলন দেখা দিয়েছে ইসরাইলে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পদত্যাগ, যুদ্ধবন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে রাস্তায় নামছে ইসরাইলিরা।
যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভে ফুঁসে উঠছে ইসরাইলিরা
শনিবার (৪ এপ্রিল) তেল আবিবে শত শত ইসরাইলি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রতিবাদে সমাবেশ করেছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে গণজমায়েতের ওপর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা একটি কেন্দ্রীয় চত্বরে জড়ো হন। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল: ‘বোমা নয়—আলোচনা করুন! অন্তহীন যুদ্ধ বন্ধ করুন!’
ইসরাইলি-ফিলিস্তিনি তৃণমূল গোষ্ঠী 'স্ট্যান্ডিং টুগেদার'-এর সহ-পরিচালক অ্যালন-লি গ্রিন বলেন, ‘আমরা এখানে ইরান, লেবানন ও গাজায় চলমান যুদ্ধ বন্ধের পাশাপাশি পশ্চিম তীরে গণহত্যা বন্ধের দাবি জানাতে এসেছি।’
এর আগে গত ২৮ মার্চও ইসরাইলজুড়ে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী যুদ্ধ অবসানের দাবিতে সমাবেশ করেছে। তেল আবিব, হাইফা ও জেরুজালেমে এ প্রতিবাদী কর্মসূচি পালিত হয়।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকট
ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর ইসরাইলিদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি ক্রমেই বাড়ছে। জ্বালানির মূল্য, খাবারের দাম, পরিবহণ খরচ-সবই বেড়েছে। বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটছে। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে বাঁচতে ইসরাইলিদের দিন-রাতের অধিকাংশ সময় বাঙ্কারে থাকতে হচ্ছে, যা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।
- উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও কাজ করতে না পারায় ইসরাইলিদের আয় কমে যাচ্ছে।
- জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে বিপরীত দিকে।
- যুদ্ধ চালাতে গিয়ে প্রতি সপ্তাহে ইসরাইলের ৩০০ কোটি ডলারের বেশি খরচ হচ্ছে।
- এতে সামগ্রিক অর্থনীতিতে ভয়াবহ সংকট তৈরি হচ্ছে এবং মুদ্রার মান কমে যাচ্ছে।
এসব কারণে যুদ্ধের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে ইসরাইলিরা। ঘরের মধ্যে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় মৃত্যুর চেয়ে তারা রাস্তায় প্রতিবাদ করে জীবন দিতে চায়।
জন্মভূমি ছাড়ছে ইসরাইলিরা
টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, গাজা সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মাঝে ২০২৩-২৪ সালে প্রায় ১ লাখ ইসরাইলি দেশত্যাগ করেছে। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ইসরাইলের মোট নাগরিকের সংখ্যা মাত্র এক কোটি।
নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকায় তারা দেশ ছাড়ছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কর্মের সন্ধানেও ছুটছে কেউ কেউ। উচ্চ দক্ষ পেশাদাররা আর যুদ্ধ পরিস্থিতির ভার সইতে চাইছে না।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, ‘অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ধাক্কা—রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত—অভিবাসনের মাত্রায় একটি তীব্র ও আকস্মিক উল্লম্ফন ঘটাতে পারে। এই প্রবণতা ইসরাইলের জন্য একটি অত্যন্ত বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’
মিশর সীমান্ত এখন পালানোর পথ
যুগ যুগ ধরে ইসরাইলি আক্রমণ থেকে বাঁচতে মিশর সীমান্ত দিয়ে পালিয়েছেন ফিলিস্তিনি মুসলিমরা। এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। গত বছর হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর গণহত্যার মাত্রা কমিয়েছে ইসরাইল। বিপরীতে, এই পথে এখন পালাচ্ছে ইসরাইলিরা।
জেরুসালেম পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আগ্রাসন শুরু করার পর ইসরাইল জুড়ে মানুষের ফোনে হোম ফ্রন্ট কমান্ডের সতর্কবার্তা বেজে ওঠে। আকাশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং বেন-গুরিয়ন বিমানবন্দরে কোনো ফ্লাইট ওঠানামা করছিল না। সর্বত্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় নাগরিক ও পর্যটকরা ভূমি ছাড়তে মরিয়া হয়ে উঠে।
২ মার্চ ইসরাইলি পর্যটন মন্ত্রণালয় তাবা সীমান্ত পারাপারের জন্য শাটল সার্ভিস পরিচালনা শুরু করেছে। মিশরের তাবা ও ইসরাইলের আইলাতের মধ্যে অবস্থিত এই ক্রসিং ইসরাইলিদের পালানোর পথে পরিণত হয়েছে।
ইসরাইলের উলটো দাবি
ইরানে আক্রমণ শুরু করার পর ইসরাইলিদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকায় জন্মভূমি ছাড়া ও প্রতিবাদী হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা দিলেও তেল আবিব দিচ্ছে উলটো তথ্য। ইসরাইলি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সূত্র দিয়ে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে আগ্রাসন শুরু করার পর ২০ হাজারের মতো ইহুদি ইসরাইলে ফিরেছে।
ইরানের প্রতিশোধমূলক আক্রমণগুলো এই পরিস্থিতিকে আরও প্রকট করে তুলেছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকানোর সক্ষমতা কমে আসছে ইসরাইলের, যা ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে ঝাঁকে ঝাঁকে ইসরাইলি পালাতে বাধ্য হচ্ছে।



