গোলাহাট বধ্যভূমি: অসমাপ্ত স্মৃতিসৌধের অপেক্ষায় ৪৫০ শহীদ
গোলাহাট বধ্যভূমি: অসমাপ্ত স্মৃতিসৌধের অপেক্ষায়

সৈয়দপুরের গোলাহাট বধ্যভূমিতে অসমাপ্ত স্মৃতিসৌধ দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৭১ সালের ১৩ জুন মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই এলাকায় সংঘটিত হয় মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড, যার শিকার হন ন্যূনতম ৪৫০ জন হিন্দু মাড়োয়ারি। মাড়োয়ারিরা মূলত ব্যবসায়ীশ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

মাড়োয়ারিদের আগমন ও বসতি

অবিভক্ত ভারতের রাজস্থান রাজ্যের যোধপুরের কাছাকাছি মাড়োয়ার অঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থান থেকে তাঁরা বাংলাদেশে আসেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য বিভাগীয় শহর ও জেলায় বসতি স্থাপন করেন। উত্তরবঙ্গের সৈয়দপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, খুলনা, কুষ্টিয়াসহ নানা স্থানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাস করছেন এবং ব্যবসায় যুক্ত থেকেছেন। এই অঞ্চলে বাণিজ্য, পাট, চাল ও খুচরা ব্যবসায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।

১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপট

১৯৭১ সালে পূর্ব বাংলা উন্মাতাল অবস্থায় ছিল। সৈয়দপুরের হিন্দু মাড়োয়ারিরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। এলাকায় বিহারি জনসংখ্যার আধিক্য ছিল, প্রায় ৬৫ শতাংশ, এবং তারা প্রভাবশালী ও স্বাধীনতাবিরোধী কাজে তৎপর ছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মুক্তিপাগল বাঙালিরা ১৯৭১ সালের ১৬ ও ২২ মার্চ সৈয়দপুরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে বিহারিদের মধ্যে। ২৩ মার্চ শুরু হয় দাঙ্গা, যা ২৪ তারিখে ব্যাপক আকার ধারণ করে। ২৫ মার্চ সকাল থেকে তারা আরও মারমুখী হয়ে হত্যা, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ করতে থাকে।

গ্রেফতার ও নির্যাতন

১ জুন ১৮৫ জন মাড়োয়ারিকে বিহারিরা আটক করে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। পাকিস্তানিদের কাছে মাড়োয়ারিদের ভারতীয় দালাল বলে উপস্থাপন করে। অত্যাচার, নির্যাতন আর গণহত্যার শিকার হন হিন্দু মাড়োয়ারিরা। বাকিরা ছিলেন যেন খাঁচায় বন্দী।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রতারণা ও গণহত্যা

পাকিস্তানিরা সৈয়দপুরের হিন্দুদের নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং এর প্রচার চালানো হয়। এই আশ্বাসের ভিত্তিতে ১৩ জুন সকাল থেকে হিন্দু মাড়োয়ারিরা সৈয়দপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে সৈয়দপুর রেলস্টেশনে জমায়েত হন এবং নির্ধারিত ট্রেনে ওঠেন। ট্রেন চিলাহাটির দিকে রওনা হয়। কিছুদূরে গোলাহাট রেল কারখানার শেষ মাথায় এসে থেমে যায় এই মৃত্যুট্রেন। যাত্রীরা দেখতে পান সশস্ত্র বিহারি, রাজাকার আর পাকিস্তানের সেনাদের। জানালা দিয়ে মুখ বের করা একজনের মাথা কেটে ফেলা হয়।

মহিউদ্দিন গুন্ডা, মিউনিসিপ্যালিটির পিয়ন মহিউদ্দিন, মেহেদী পানওয়ালা, ফরহাদ টেইলারসহ আরও অনেকে লাফ দিয়ে ওঠে ট্রেনে। হাতে রামদা, বল্লম, তলোয়ার আর অন্যান্য মারণাস্ত্র নিয়ে কাটতে থাকে একজনের পর একজনকে। মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নেয় শিশুকে। একটানে ছিঁড়ে ফেলে হাত–পা, আকাশের দিকে ছুড়ে দিয়ে তলোয়ার বিদ্ধ করে নিচের দিকে নেমে আসা সেসব শিশুদেহকে। আবার কাগজ ছেঁড়ার মতো দুই পা দুই দিকে ছিঁড়ে ফেলে অনেক শিশুদেহ। ট্রেন থেকে লাফিয়ে নামাদের মেশিনগানের ব্রাশ ফায়ারে শেষ করে দেয়।

হত্যাকারীদের অনেকেই মাড়োয়ারিদের চেনাজানা ও পরিচিতজন ছিলেন। অনেক অনুনয়–বিনয় করেও বাঁচতে পারেননি তাঁরা।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা

বিভৎস হত্যাকাণ্ড দেখে অনেক ট্রেনযাত্রী হত্যাকারীদের অনুরোধ করেন তাঁদের গুলি করে মেরে ফেলতে। পাকিস্তানিরা বলে যে না, পাকিস্তান সরকারের গুলির দাম আছে, তাই এদের মারতে গুলি খরচ করা হবে না। রক্তে রক্তে ভেসে যায় গোলাহাট রেলওয়ে কালভার্ট, সেই গণহত্যা লীলাভূমি।

সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ড থেকে অলৌকিকভাবে ফিরে আসা প্রত্যক্ষদর্শীদের কথা আমরা শুনি।

দায়ীদের বিচার

মানবসভ্যতার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে দায়ী সৈয়দপুর শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান বিহারি কাইয়ুম খান। বাংলার বুকে শহীদ সেই মাড়োয়ারিদের প্রতি আমি নতশির, অতল শ্রদ্ধা আর সালাম। বিচার চাই সব গণহত্যার।

*লেখক: খালিদা আক্তার, নির্বাহী পরিচালক, জেনোসাইড জাস্টিস অ্যান্ড রিসার্চ ফোরাম