রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুদ্ধ অবসানের বিষয়ে তাঁর সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের আহ্বান জানালেও তিনি এখন এমন কোনো বৈঠকের প্রয়োজন দেখছেন না।
জেলেনস্কির খোলা চিঠি
গত বৃহস্পতিবার জেলেনস্কি পুতিনের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। সে চিঠিতে তিনি পুতিনকে সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানান। চিঠিতে জেলেনস্কি লিখেছেন, ২০২২ সালে শুরু হওয়া এ যুদ্ধ আবারও যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মনোযোগের বিষয় হয়ে উঠবে—এমন আশায় হাত গুটিয়ে বসে থাকা ভুল কাজ হবে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট চিঠিতে যুদ্ধবিরতিরও আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে চিঠিতে তিনি কিছু বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ করেছেন, কিছু ক্ষেত্রে বিদ্রূপাত্মক সুর ব্যবহার করেছেন।
পুতিনের প্রতিক্রিয়া
রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন চিঠিটিকে ‘অশোভন’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জেলেনস্কির বৈঠকের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে পুতিন আবারও জোর দিয়ে বলেছেন, যেকোনো যুদ্ধবিরতির আগে শান্তি আলোচনা হওয়া উচিত। গতকাল শুক্রবার সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরামে সাংবাদিকেরা পুতিনের কাছে জানতে চান, তিনি জেলেনস্কির প্রস্তাব গ্রহণ করবেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, গ্রহণ করার কোনো কারণ তিনি আপাতত দেখছেন না।
পুতিন আরও বলেন, ‘এটি কি মুখোমুখি বৈঠকের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা ছিল, নাকি এমন একটি পদক্ষেপ ছিল যাতে মুখোমুখি বৈঠকই না হয়? আমার মনে হয়, দ্বিতীয়টিই ঠিক।’
যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা
জেলেনস্কির চিঠি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে পুতিন আবারও তাঁর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। বলেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে ইউক্রেন শুধু নিজেদের পুনর্গঠনের সুযোগ পাবে। অথচ কিয়েভের কাছে মস্কো যে ছাড়গুলো দাবি করছে, সেগুলো পূরণ হয়নি। পুতিন বলেন, ‘এর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো ইউক্রেনীয় পক্ষ আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রযাত্রা থামাতে চায়। কিন্তু আমাদের দরকার সমঝোতা। তা ছয় মাসের জন্য নয়, তিন মাসের জন্যও নয়, বরং দীর্ঘ মেয়াদে।’ পুতিন আরও বলেন, ‘বিশেষজ্ঞদের কাজ করতে ও কিছু সমাধান বের করতে দিন। এরপর আমরা বৈঠকে বসতে পারি।’
যুদ্ধের লক্ষ্য
পুতিন বলেছেন, রাশিয়া যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছে, সেগুলো অর্জিত হলেই শুধু যুদ্ধের অবসান হবে। তিনি বলেন, ‘সামরিক অভিযান একদিন না একদিন শেষ হবেই। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সেটি তখনই শেষ হবে, যখন আমরা নিজেদের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারব।’ রাশিয়ার দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো, ইউক্রেনকে দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি ইউক্রেনকে ন্যাটোতে যোগদানের চেষ্টা থেকে সরে আসতে হবে।
ইউক্রেনের অবস্থান
তবে কিয়েভ কোনো ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে রাজি নয়। ইউক্রেনের যুক্তি, মস্কোকে কোনো ধরনের ছাড় দিলে ভবিষ্যতে তারা আবারও আগ্রাসন চালাতে উৎসাহিত হবে। এ ক্ষেত্রে তারা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ক্রিমিয়া উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আট বছর পর রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার হামলা শুরু করেছে।
জেলেনস্কির চিঠির বিতর্কিত অংশ
জেলেনস্কি খোলা চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘২৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর পুতিনের ওপর বয়সের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।’ একই সঙ্গে তিনি সম্প্রতি রাশিয়ার ভূখণ্ডে ইউক্রেনের হামলার কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার সেন্ট পিটার্সবার্গে কিয়েভের চালানো একটি হামলাকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। প্রতিক্রিয়ায় পুতিন বলেন, জেলেনস্কির চিঠিতে ‘কিছু অত্যন্ত অশোভন মন্তব্য’ ছিল।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এরপরও জেলেনস্কির চিঠির বিষয়বস্তু কিছু মহলে শান্তি আলোচনার আশা জাগিয়েছে। এর মধ্যে হোয়াইট হাউসও আছে। চিঠির বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘দুই নেতা যদি সত্যিই সাক্ষাৎ করেন, তবে সেটি দারুণ হবে।’
ইউক্রেনের ড্রোন হামলা
এদিকে গতকাল ইউক্রেন দাবি করেছে, তারা আজভ সাগর ও রাশিয়ার দখলে থাকা উপকূলীয় অঞ্চলের জলসীমায় অবৈধ পণ্য বহনকারী পাঁচ জাহাজে হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনের ড্রোন বাহিনীর কমান্ডার রবার্ট ব্রভদি বলেন, জাহাজগুলো ইউক্রেনের শস্য ‘চুরি’ করার সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া এগুলো জ্বালানি ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হয়। আজারবাইজানের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, আজভ সাগরে দুটি জাহাজে হামলার ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। তবে হামলার জন্য তারা কাউকে দায়ী করেনি। দেশটির কর্তৃপক্ষ বলেছে, জাহাজ দুটি আজারবাইজানের ছিল না।
রুশ হামলায় হতাহত
অন্যদিকে গত এক দিনে ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার ধারাবাহিক হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত ও আরও ৭০ জন আহত হয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এমন তথ্য জানিয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে কিয়েভের কাছে একটি দুগ্ধ কারখানায় হামলার ঘটনায়। এ ছাড়া খেরসনে একটি পেট্রল স্টেশনে ড্রোন হামলায় ৩৫ বছর বয়সী এক নারী নিহত হয়েছেন।



