ফ্রান্সে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ: মাত্র ২৫% পরিবারে এসি, মৃত্যু ২৫০ ছাড়িয়েছে
ফ্রান্সে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ: মাত্র ২৫% পরিবারে এসি

ফ্রান্সে তীব্র তাপপ্রবাহ: এসির অভাব ও মৃত্যু

ফ্রান্সের বর্তমান তীব্র ও প্রাণঘাতী গরম নিয়ে দেশটির সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো একটি সাধারণ বাক্যই বারবার শোনা যাবে, 'আমার কোনও এসি নেই।' কেউ কেউ আবার চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, 'এ যেন পৃথিবীর বুকে নরক।' ২০২০ সালের সরকারি এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সের মাত্র এক-চতুর্থাংশ (২৫ শতাংশ) পরিবারে এসি আছে। যুক্তরাজ্যের অবস্থা আরও করুণ, সেখানে মাত্র ১৪ শতাংশ বাড়িতে এসি রয়েছে।

ইউরোপে এসির ব্যবহার ও বিশেষজ্ঞ মতামত

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানায়, সামগ্রিকভাবে পুরো ইউরোপের মাত্র ২০ শতাংশ মানুষের ঘরে এসি আছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল এসি দিয়ে এই তাপপ্রবাহের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; বরং ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে এটি উল্টো নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

প্যারিসের ঐতিহ্যবাহী ছাদ ও তাপ সমস্যা

প্যারিসের চিরচেনা নীল-ধূসর রঙের ছাদগুলো শহরের ঐতিহ্য এবং আইন দ্বারা সুরক্ষিত। তবে জিংক দিয়ে তৈরি এই ছাদগুলোতে কোনও তাপ-নিরোধক ব্যবস্থা নেই। কাচের জানালার কারণে তীব্র গরমে ওপরের তলার বাসিন্দাদের অবস্থা হয় ওভেনের ভেতরের মতো। ৫৪ বছর বয়সী সেভারিন লে বুজিট বলেন, 'আমি রাতে ঘুমাতে পারছি না। পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ।' চিকিৎসকেরা বলছেন, ঘুমের এই ব্যাঘাত মানুষের চিন্তাশক্তি কমিয়ে দেয় এবং বিশ্রামের সময়েও শরীর যেন ম্যারাথন দৌড়ের মতো ক্লান্ত বোধ করে। কিন্তু এসি ঘরের ভেতর ঠান্ডা করলেও বাইরের পরিবেশে গরম বাতাস ছেড়ে দেয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আর্বান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট ও বিদ্যুৎ সংকট

ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থার জলবায়ু ঝুঁকি বিশেষজ্ঞ হ্যান্স-মার্টিন ফুসেল ব্যাখ্যা করেন, ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে এসি ঘরের তাপ বাইরে ফেলে শহরকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে, যাকে 'আর্বান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট' বলা হয়। কংক্রিটের শহর এই তাপ আটকে রেখে তাপমাত্রা আরও কয়েক ডিগ্রি বাড়িয়ে দেয়, যা পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তোলে। আরেকটি বড় দুশ্চিন্তা হলো বিদ্যুৎ সংকট। গ্র্যান্থাম ইনস্টিটিউটের গবেষক ক্লেয়ার বার্নস জানান, মানুষের তৈরি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ইউরোপের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ থেকে ৪ ডিগ্রি বেশি অনুভূত হচ্ছে। ওমেগা আকৃতির এই তাপ বলয়ের কারণে ফ্রান্সে বাতাসের গতি কমে গেছে এবং পারমাণবিক কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় শীতল পানির অভাব দেখা দিয়েছে। ফলে উইন্ড টারবাইন ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদন কমে গেছে এবং বিদ্যুতের দাম অনেক বেড়ে গেছে।

মৃত্যু ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রভাব

এই তীব্র গরমে গত এক সপ্তাহে হিটস্ট্রোক, পানিতে ডুবা এবং গাড়ির ভেতরে শিশু আটকে থাকাসহ বিভিন্ন কারণে ২৫০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্রতার কারণে এমআরআই স্ক্যানার বিকল হয়ে পড়ায় চিকিৎসা সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট জানান, জরুরি চিকিৎসায় ফোন কল ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সমাধান ও সতর্কতা

তবে ফুসেল মনে করেন, সমাধানগুলো সবার জানা থাকলেও তা বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। সমাধান হিসেবে তিনি শহরের ফাঁকা জায়গা সবুজ করা, নির্দিষ্ট শীতল অঞ্চল তৈরি করা এবং জরুরি বিভাগের কর্মীদের ছুটির সময় পুনর্নির্ধারণের ওপর জোর দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইউরোপের অনেক ভাড়াটিয়ার নিজের ঘরে এসি লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। ফলে যারা গরমে ভুগছেন, তারা চাইলেই এসির সুবিধা নিতে পারছেন না।