বন্যায় ধান ডুবায় কৃষকের আত্মহত্যা, নাসিরনগরে মর্মান্তিক ঘটনা
বন্যায় ধান ডুবায় কৃষকের আত্মহত্যা, নাসিরনগরে মর্মান্তিক

নাসিরনগরের কৃষক মো. নজরুল ইসলাম ওরফে আহাদ মিয়া তাহার জমির আইলে দাঁড়াইয়া দেখিতেছিলেন তাহার স্বপ্নের সলিলসমাধির মর্মান্তিক দৃশ্য। প্রবল বেদনার সহিত তিনি দেখিতেছিলেন- চারিদিকে পানি, আর সেই পানির নিচে ডুবিয়া গিয়াছে তাহার সমস্ত পরিশ্রম, সমস্ত স্বপ্ন। কী খেলিয়া যাইতেছিল তাহার অন্তরে, অন্তর্যামী জানেন শুধু; কিন্তু আমরা জানিলাম তাহার অকস্মাৎ মৃত্যুর কথা।

মায়া আর ঋণের বোঝা

আহাদ মিয়া বলিয়াছিলেন- ‘মায়া লাগে, তাই জমিতে আসি’! কীসের মায়া? তিনি পুটিয়া বিলের পাঁচ বিঘা জমিতে মায়া বুনিয়াছিলেন। দেড় লক্ষ টাকার অধিক খরচ, ধারদেনা, এনজিও হইতে ঋণ- সকল মিলাইয়া তাহার একটাই আশা ছিল- পাকা ধান ঘরে তুলিবেন। পরিবারের সারা বৎসরের খরচ ও এনজিওর কিস্তি পরিশোধ করিবেন; কিন্তু সেই ধানই যখন চোখের সামনে পানির নিচে তলাইয়া যাইতে থাকে, তখন আর নিজেকে সামলাতে পারেন নাই।

প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই

প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করিয়া, ঋণের বোঝা কাঁধে লইয়া, পরিবারকে বাঁচাইবার এক অদম্য প্রচেষ্টা এই দেশের কৃষকদের নিত্যদিনের সংগ্রামের অংশ; কিন্তু কখনো কখনো সেই সংগ্রাম এমন এক নিষ্ঠুর পরিণতির দিকে গড়ায়, যাহা আমাদের হৃদয়কে কাঁদাইয়া দেয়, চোখ আর্দ্র হইয়া উঠে। বিশেষ করিয়া, হাওরের কৃষকের দুর্দশার এর দৃশ্য অত্যন্ত মর্মান্তিক। যদিও অকালবর্ষণ, অকস্মাৎ ঢল, প্রবল বন্যা তাহাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; কিন্তু এই বৎসরের পরিস্থিতি কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল বলিয়া মানিয়া লওয়া কষ্টকর।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাঁধ ভাঙার অভিযোগ

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে দেখা যায়, একের পর এক বাঁধ ভাঙিয়া পড়িতেছে; কোথাও নির্মাণে অনিয়ম, কোথাও দায়সারা কাজের অভিযোগ। ফলে যেই পানি নিয়ন্ত্রণের কথা ছিল, সেই পানিই আজ নিয়ন্ত্রণহীন হইয়া কৃষকের ঘরে ঘরে দুর্ভোগ ডাকিয়া আনিয়াছে। আরও বেদনাদায়ক হইল এই যে, কৃষকেরা শেষমুহূর্ত পর্যন্ত লড়িবার চেষ্টা করিয়াছেন। বুক-সমান পানিতে নামিয়া তাহারা পচা ধান কাটিয়াছেন, কাদা ঠেলিয়া আঁটি তুলিয়াছেন, কেবল এই আশায়- কিছু যদি রক্ষা করা যায়; কিন্তু সেই ধানই আবার বৃষ্টির কারণে মাড়াই করা যায় নাই, স্তূপ করিয়া রাখা অবস্থায় পচিয়া গিয়াছে, কোথাও-বা ধানের শিষেই চারা গজাইয়া উঠিয়াছে।

ব্যর্থতার পিছনে দায়

অর্থাৎ, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করিয়া সামান্য যা রক্ষা করিবার চেষ্টা, তাহাও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইয়াছে। এই ব্যর্থতার পিছনে কেবল প্রকৃতি দায়ী নহে। প্রশাসনের বক্তব্যে অসংগতি, তথ্যের বিভ্রান্তি এবং দায় এড়ানোর প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও হতাশাজনক করিয়া তুলিয়াছে। কোথাও বলা হইতেছে, ধান কাটা শেষ; আবার বাস্তবে হাজার হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে তলাইয়া আছে। এই বিচ্ছিন্নতা- নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবতার মধ্যে- আমাদের কৃষি ব্যবস্থাপনার গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।

সমাধানের পথ

যখন দুর্বল বাঁধ নির্মাণের কারণে ফসল ডুবিয়া যায়, যখন ক্ষতিপূরণের আশ্বাস বাস্তবতায় রূপ পায় না, কৃষকের জীবন তখন হইয়া উঠে অনিশ্চয়তার এক অন্তহীন চক্র। এই চক্র ভাঙিবে না, যদি আমরা এখনো দায়িত্বশীল ও টিকসই ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তুলিতে না পারি। বাঁধ নির্মাণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা প্রদান এবং দীর্ঘমেয়াদি হাওর ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি বটে।

আহাদ মিয়া একটি প্রতীক

আহাদ মিয়া কোনো পরিসংখ্যান নন। আজ তিনি এই দেশের কৃষকের অসহায়তার প্রতীক, আমাদের ব্যবস্থার নিষ্ঠুরতার প্রতীক, আমাদের বিবেকের নীরবতার প্রতীক। প্রশ্নটি তাই খুব সরল, কিন্তু অত্যন্ত কঠিন- আর কতজন কৃষক জমির আইলে লুটাইয়া পড়িলে আমরা বুঝিব, ইহা কেবলই প্রাকৃতিক দুর্যোগ নহে? যদি এই প্রশ্নের উত্তর আমরা আজ না খুঁজি, তাহা হইলে আগামীকাল হয়তো আরেক জন কৃষক একইভাবে দাঁড়াইয়া থাকিবেন- চারিদিকে পানি, সামনে ডুবিয়া যাওয়া স্বপ্ন। স্বপ্নের সলিলসমাধির সহিত তিনিও হয়তো বজ্রাহতের মতো ভূপতিত হইবেন। আমরা কেবল আহা-উহু করিব! কথার ফুলঝুরি ফুটাইব। অনিশ্চিত জীবনের চাইতে ভয়ংকর বিপদ কী আছে- এই সত্য আমরা আর কবে বুঝিব?