বজ্রপাত: ১০টি জরুরি প্রশ্নের উত্তর যা জানা জরুরি
বজ্রপাত: ১০টি জরুরি প্রশ্নের উত্তর যা জানা জরুরি

বজ্রপাত: ১০টি জরুরি প্রশ্নের উত্তর

বাংলাদেশে প্রতিবছর বজ্রপাতে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়। সম্প্রতি তিন দিনে সারাদেশে অন্তত ২৮ জনের মৃত্যুর খবর এসেছে, যার মধ্যে ২৭ এপ্রিল একদিনেই মারা গেছেন ১৪ জন। এমনকি চুরি হওয়ার ভয়ে রাত জেগে বজ্রপাতে মৃত সন্তানের লাশ পাহারা দেওয়ার ঘটনাও শিরোনাম হয়েছে। বজ্রপাত কেন হয়, আহত হলে কী করবেন, এবং মৃতদেহ চুরির কারণ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়েই বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন।

বজ্রপাত কী?

বজ্রপাত একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক ঘটনা, যা পৃথিবীর যেকোনো স্থানে হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির তথ্য অনুসারে, প্রতি মিনিটে ছয় হাজার বজ্রপাত হয়, যা দিনে ৮০ লাখের বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে বছরে প্রায় চার কোটি বজ্রপাত ঘটে, তবে শিকারদের ৯০ শতাংশই বেঁচে যান। বাংলাদেশে ২০১৬ সালে দুই দিনে অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যুর পর বজ্রপাতকে 'জাতীয় দুর্যোগ' ঘোষণা করা হয়। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে বজ্রপাতে তিন হাজার ৬৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বজ্রপাত কীভাবে হয়?

বজ্রপাতের জন্য তিনটি উপাদান প্রয়োজন: বাতাসের আর্দ্রতা, অস্থিতিশীল বায়ু এবং ঊর্ধ্বমুখী বল। সাগর থেকে আর্দ্রতা বাষ্পীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে। উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের ওপর শুষ্ক শীতল বাতাস থাকলে অস্থিতিশীল বায়ু সৃষ্টি হয়, যা ঊর্ধ্বমুখী বল তৈরি করে। এই বজ্রঝড়ের ভেতরে বরফ ও পানির মিশ্রণ ঘর্ষণের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক চার্জ জমা করে, যা যথেষ্ট বড় হলে বজ্রপাত হয়। বজ্রপাতের সময় বায়ুর তাপমাত্রা প্রায় ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা শকওয়েভ সৃষ্টি করে এবং বজ্রধ্বনি হিসেবে শোনা যায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বৃষ্টি ছাড়াও কি বজ্রধ্বনি হতে পারে?

হ্যাঁ, একে 'শুষ্ক বজ্রঝড়' বলে। মেঘের নিচের বায়ুস্তর খুব গরম বা শুষ্ক থাকায় বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পৌঁছানোর আগেই বাষ্প হয়ে যায়। এই বজ্রঝড় দাবানল সৃষ্টির জন্য কুখ্যাত, কারণ আগুন নেভানোর মতো বৃষ্টি থাকে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ব্যক্তির ওপর বজ্রপাত হলে কী হয়?

বজ্রপাতে আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির শরীরে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, যা স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং মস্তিষ্কে আঘাত ও হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ করে দিতে পারে। সামান্য আঘাতে পেশিতে ব্যথা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, বিভ্রান্তি, স্মৃতিশক্তির সমস্যা, মাথা ঘোরা এবং ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে ধীর প্রতিক্রিয়া, খিটখিটে মেজাজ, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, ঘুমের সমস্যা, কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ, বিষণ্ণতা এবং ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন হতে পারে।

বজ্রপাতে মৃত লাশ চুরি করা হয় কেন?

এটি কুসংস্কারের কারণে হয়। অনেকের ধারণা, বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির লাশ চুম্বক হয়ে যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি অন্ধ বিশ্বাস। বৈদ্যুতিক শকে মারা যাওয়া ব্যক্তির মৃতদেহের সঙ্গে বজ্রপাতে মৃতের কোনো পার্থক্য নেই বলে জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সাবেক প্রধান সোহেল মাহমুদ।

বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায়

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম এ ফারুখ জানান, বজ্রপাতে মৃতদের ৮৭ শতাংশই উন্মুক্ত স্থানে ছিলেন। বজ্রপাতের সময় বাইরের কোনো জায়গা নিরাপদ নয়। তাই বজ্রধ্বনি শোনার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ স্থানে যেতে হবে। সম্ভব না হলে উঁচু গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ধাতব পদার্থ বা মোবাইল টাওয়ার থেকে দূরে থাকতে হবে। বজ্রঝড় সাধারণত ৪০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা স্থায়ী হয়, এ সময় ঘরে থাকতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে রাবারের জুতা পরে বের হতে হবে। ধানক্ষেত বা খোলামাঠে থাকলে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে কানে আঙুল দিয়ে নিচু হয়ে বসতে হবে। দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে, কিন্তু ছাদে বা উঁচু জায়গায় যাওয়া যাবে না। নদী বা সমুদ্রে থাকলে নৌকার ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। গাড়িতে থাকলে ধাতব অংশ স্পর্শ করা যাবে না। ঘরেও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, সিঙ্ক, বাথটাব, কল, কংক্রিটের দেয়াল ও মেঝে, জানালা ও দরজা থেকে দূরে থাকতে হবে।

বজ্রপাতে আহতদের চিকিৎসা

আহত ব্যক্তিকে বৈদ্যুতিক শকের মতো চিকিৎসা দিতে হবে। দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দন ফিরিয়ে আনতে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস ও সিপিআর দিতে হবে। কয়েক মিনিটের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে পারলে বাঁচানো সম্ভব। অ্যাম্বুলেন্স বা গাড়ি ডেকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। আহত ব্যক্তিকে ধরতে কোনো সমস্যা নেই, কারণ তার শরীরে বিদ্যুৎ থাকে না।

এক জায়গায় বারবার বজ্রপাত হয়?

ইংরেজি প্রবাদ 'লাইটেনিং নেভার স্ট্রাইক্স দ্য সেইম প্লেস টোয়াইস' এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা বলছে, বজ্রপাতের জন্য সুবিধাজনক জায়গায় বারবার বজ্রপাত হতে পারে।

বাংলাদেশে কেন এত বেশি বজ্রপাত হয়?

ভৌগোলিক অবস্থানই প্রধান কারণ। একদিকে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর থেকে গরম ও আর্দ্র বাতাস আসে, অন্যদিকে উত্তরে হিমালয় থেকে ঠাণ্ডা বাতাস। এই দুই বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

এ বছর বজ্রপাত বেশি হওয়ার কারণ

দক্ষিণাঞ্চলে, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের ওপর আর্দ্রতা বেশি থাকায় মেঘের পরিমাণ বেড়েছে। অধ্যাপক ফারুখ বলেন, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বাড়ার সঙ্গে তাপপ্রবাহ মিলে বজ্রঝড়ের প্রাদুর্ভাব বাড়াচ্ছে। গত ২০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বন্যার তুলনায় বজ্রপাতে দ্বিগুণের বেশি মানুষ মারা যায়। বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণার ১০ বছর পরও সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।