মহাকর্ষীয় লেন্সিং: মহাবিশ্বের আলো বাঁকানোর অদ্ভুত ঘটনা
মহাকর্ষীয় লেন্সিং: মহাবিশ্বের আলো বাঁকানোর অদ্ভুত ঘটনা

মহাকাশফাইল ছবি: রয়টার্স

জ্বলন্ত মোমবাতির সামনে একটি কাচের গ্লাস ধরে রাখলে গ্লাসের বক্রতা মোমবাতির শিখার আলোকে বাঁকিয়ে দেয়। আর তাই শিখাকে প্রসারিত বলয় বা বৃত্তের মতো দেখায়। এখন পুরো বিষয়টিকে মহাকাশের বিশালতায় চিন্তা করুন। কাচের গ্লাসের বদলে সেখানে রয়েছে কোটি কোটি নক্ষত্রের ভরের একটি গ্যালাক্সি (ছায়াপথ) আর মোমবাতির শিখার বদলে রয়েছে শতকোটি আলোকবর্ষ দূরে থাকা অন্য একটি গ্যালাক্সি। ফলাফল হিসেবে আপনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম সুন্দর ও শক্তিশালী একটি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করবেন। একে বিজ্ঞানীরা বলেন গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং বা মহাকর্ষীয় লেন্সিং।

মহাকর্ষীয় লেন্সিং কীভাবে কাজ করে?

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মতে, মহাকাশে কোনো বিশাল ভরের বস্তু থাকলে তা তার চারপাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেয়। আলো যখন এই বাঁকানো পথ দিয়ে যায়, তখন সেটিও গ্যালাক্সি বা গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের মতো বিশাল ভরের বস্তুর চারপাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বেঁকে যায়। যখন এই সারিবদ্ধকরণ একেবারে নির্ভুল হয়, তখন এক অসাধারণ দৃশ্য তৈরি হয়। পেছনের দিকের দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোকে প্রসারিত উজ্জ্বল ধনুকের মতো বা নিখুঁত বলয়ের মতো দেখায়। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় আইনস্টাইন রিং। এটি চোখের কোনো ধাঁধা নয়। মহাবিশ্ব নিজেই নিজের চারপাশের আলোকে বাঁকিয়ে দিচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইউক্লিড টেলিস্কোপের ভূমিকা

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ইউক্লিড টেলিস্কোপ ইতিমধ্যে মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে বদলে দিচ্ছে। সম্প্রতি এটি এক অভূতপূর্ব স্কেলের বিশাল তথ্যভান্ডার অবমুক্ত করেছে। আর এই বিশাল তথ্যভান্ডারে নতুন মহাকর্ষীয় লেন্স খুঁজে বের করতে সাধারণ মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বিজ্ঞানীদের। এর ফলে জুনাইভার্স প্ল্যাটফর্মে শুরু হওয়া স্পেস ওয়ার্পস নামের একটি সিটিজেন সায়েন্স প্রকল্পের আওতায় অপেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং সাধারণ মানুষ বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইউক্লিড টেলিস্কোপে ধারণ করা ছবিতে লুকিয়ে থাকা গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সগুলো খুঁজে বের করবেন।

নাগরিক বিজ্ঞানের শক্তি

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সিটিজেন সায়েন্স বা নাগরিক বিজ্ঞানের শক্তি অনেক। এর আগে ‘সেটি অ্যাট হোম’ প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তাঁদের কম্পিউটারের অলস সময় ব্যবহার করে ভিনগ্রহী বুদ্ধিমত্তার সংকেত খুঁজেছে। স্পেস ওয়ার্পস ঠিক একই উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করছে। এবারের লক্ষ্য ভিনগ্রহের প্রাণী নয়, মহাকাশের আলো বাঁকিয়ে দেওয়া লেন্স শনাক্ত করা।

মহাকর্ষীয় লেন্সের গুরুত্ব

মহাকর্ষীয় লেন্স মূলত গ্যালাক্সির জন্য প্রাকৃতিক ওজন মাপার যন্ত্র হিসেবে কাজ করে। এর মাধ্যমে একটি গ্যালাক্সিতে থাকা মোট পদার্থের পরিমাণ মাপা যায়। বিশেষ করে কৃষ্ণবস্তু, যা কোনো আলো দেয় না বা প্রতিফলিত করে না, তার উপস্থিতি কেবল এই লেন্সিংয়ের মাধ্যমেই নির্ণয় করা সম্ভব। হাজার হাজার লেন্সিং সিস্টেমের তালিকা তৈরি করে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করবেন, কীভাবে মহাবিশ্বের কাঠামো গড়ে উঠেছে এবং কীভাবে ডার্ক এনার্জি মহাবিশ্বের এই ক্রমবর্ধমান সম্প্রসারণকে ত্বরান্বিত করছে।

আপনিও অংশ নিতে পারেন

এই বিশাল মহাজাগতিক অভিযানে অংশ নিতে আপনার কোনো টেলিস্কোপ বা পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রির প্রয়োজন নেই। মহাবিশ্ব সম্পর্কে কেবল কৌতূহল এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থাকলেই আপনি ঘরে বসে বিশ্বের বড় বড় জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সহযোগী হতে পারেন। বিস্তারিত জানা যাবে এই ঠিকানা থেকে।

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট

প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন