সড়ক দুর্ঘটনায় এক পরিবারের চারজন নিহত, শোকে ভেঙে পড়লেন শয্যাশায়ী বৃদ্ধ বাবা
সড়ক দুর্ঘটনায় এক পরিবারের চারজন নিহত, শোকে ভেঙে পড়লেন বৃদ্ধ বাবা

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত একই পরিবারের চারজনকে শেষবারের মতো দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন এলাকার শত শত মানুষ। আজ রোববার বিকেল চারটায় মাদারীপুর সদর উপজেলার মস্তফাপুর ইউনিয়নের বালিয়া এলাকায় বাড়িভর্তি লোকজন। ঘরের ভেতর থেকে স্বজনদের চিৎকার ও কান্নাকাটির শব্দ ভেসে আসছে।

শয্যাশায়ী পিতার বিলাপ

বৃদ্ধ ওয়াহেদ মোল্লা জানেন না তাঁর দুই ছেলে ও পুত্রবধূদের সঙ্গে কী হয়েছে, তবে তিনি জেনেছেন তাঁরা কেউ বেঁচে নেই। তাই তিনি বুক চাপড়ে কান্নাকাটি করছেন। আজ রোববার দুপুরে মাদারীপুর সদর উপজেলার মস্তফাপুর ইউনিয়নের বালিয়া এলাকার মো. ওয়াহেদ মোল্লার (৯২) বাড়ি গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেল। সড়ক দুর্ঘটনায় দুই ছেলে ও দুই পুত্রবধূকে হারিয়ে বিলাপ যেন থামছে না শয্যাশায়ী ওয়াহেদের। তিনি বারবার আহাজারি করে বলছেন, ‘আমার বাপে গো লগে এইয়া কী হইলো রে। আল্লাহ রে তুমি এইডা কী করলা রে!’

দুর্ঘটনার বিবরণ

আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা–বরিশাল মহাসড়কের নগরকান্দা সদর উপজেলার শংকরপাশা এলাকায় যাত্রীবাহী বিআরটিসি বাসের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের চারজনসহ পাঁচজন নিহত হন। নিহত সবার বাড়ি মাদারীপুরে। তাঁদের মধ্যে চারজন হলেন ওয়াহেদ মোল্লার দুই ছেলে জাহাঙ্গীর মোল্লা (৬৫) ও আলমগীর মোল্লা (৬০), জাহাঙ্গীরের স্ত্রী মাজেদা আক্তার ওরফে বেলি (৫৫) ও আলমগীরের স্ত্রী খুশিদা বেগম (৫০)।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাত্রা

স্বজনেরা জানান, দুই বছর ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন আলমগীর মোল্লা। তাঁর চিকিৎসার জন্য আজ সকালে তাঁর বড় ভাই জাহাঙ্গীর মোল্লা একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করেন। এ সময় আলমগীর মোল্লার সঙ্গে তাঁর স্ত্রী, বড় ভাই ও তাঁর অসুস্থ স্ত্রীও অ্যাম্বুলেন্সে ওঠেন। তাঁরা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে আজই আবার মাদারীপুরে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা–বরিশাল মহাসড়কের নগরকান্দা সদর উপজেলার শংকরপাশা এলাকায় পৌঁছালে বিআরটিসির একটি বাসের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

উদ্ধার তৎপরতা

এ ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্সটি দুমড়েমুচড়ে যায়। খবর পেয়ে নগরকান্দা ফায়ার সার্ভিস ও ভাঙ্গা হাইওয়ে থানা–পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। পরে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর থেকে চালকসহ পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। দুর্ঘটনায় বাসের কয়েকজন যাত্রী সামান্য আহত হয়েছেন। তবে বাসটির বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হয়নি।

শোক ও সান্ত্বনা

দুই ছেলে ও পুত্রবধূদের হারানো ওয়াহেদ মোল্লাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন স্বজনেরা। নিহত ব্যক্তিদের ভাতিজা রাকিব মোল্লা বলেন, ‘আমার চাচা আলমগীর মোল্লা দুই বছর ধরে অসুস্থ। তাঁকে ডাক্তার দেখাতে ফরিদপুর মেডিকেলে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁরা মারা গেছেন। তাঁদের এমন মৃত্যু আমরা কেউ মানতে পারছি না। সবাই তাঁদের মৃত্যুতে শোকাহত। এলাকায় সবার কাছে ভালো মানুষ ছিলেন তাঁরা। এক পরিবারের চারজন এভাবে মারা যাবেন, এটা কেউ মানতে পারছি না।’

আলমগীর মোল্লার ভগ্নিপতি ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘পরিবারটি পথে বসে গেল। নিহত ব্যক্তিদের সন্তানেরা এতিম হয়ে গেল। আমরা কীভাবে এই শোক কাটিয়ে উঠব, জানি না।’

প্রতিবেশী আজাদ হাওলাদার বলেন, বৃদ্ধা মো. ওয়াহেদ মোল্লার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। দুই ছেলে ও তাঁদের স্ত্রীদের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি ঢাকা থেকে চলে এসেছেন। কোনোভাবেই বিষয়টি মেনে নেওয়ার মতো নয়। তাঁদের মৃত্যুতে পুরো এলাকা শোকাহত।

দাফনের প্রস্তুতি

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত জাহাঙ্গীর মোল্লা, আলমগীর মোল্লা ও তাঁদের দুই স্ত্রীকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। ইতিমধ্যে স্থানীয় লোকজন মোল্লা বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাঁদের কবর খোঁড়ার কাজ শেষ করেছেন। প্রতিবেশীরা বাড়ির সামনে বাঁশ কেটে ও মাটি খোঁড়ার কাজ করছেন।

প্রতিবেশী দেলোয়ার শিকদার বলেন, নিহত দুই ভাই ও তাঁদের স্ত্রীদের কবর একসঙ্গে খোঁড়া হয়েছে। পাশেই জাহাঙ্গীর ও আলমগীরের মা রিজিয়া বেগমকে শায়িত করা হয়েছে। একসঙ্গে চারজনের কবর এই এলাকায় আগে কেউ কখনো করেনি।