সুন্দরবনের সমুদ্রমুখী এলাকা জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্র আঘাতে ভাঙনের কবলে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও মানবসৃষ্ট চাপের কারণে সুন্দরবনের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার ক্ষমতা বা স্থিতিস্থাপকতা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। গত ২৫ বছরে বনের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ এলাকায় এই সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আয়তনের হিসাবে যা প্রায় ৬১০ থেকে ৯৯০ বর্গকিলোমিটার। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন নিয়ে নতুন এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সুন্দরবনের গুরুত্ব ও চাপ
সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, বাংলাদেশের উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমির, শুশুক, অসংখ্য মাছ, পাখি ও উদ্ভিদের আবাস এই বন। উপকূলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা অপরিসীম। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বনটির ওপর চাপ বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। এই পরিস্থিতিতে আজ শুক্রবার আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস পালিত হচ্ছে।
গবেষণার ফলাফল
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন হংকং পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি, জার্মানির লাইবনিজ সেন্টার ফর ট্রপিক্যাল মেরিন রিসার্চ এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। ২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত উপগ্রহচিত্র ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা এই ফলাফল তুলে ধরেন।
গবেষণায় পুরো বনকে ২৫০ মিটার করে ভাগ করে প্রতিটি অংশের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, গত ২৫ বছরে সুন্দরবনের প্রতিটি এলাকা অন্তত এক থেকে আটবার বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়েছে। এসব আঘাতের পর অনেক এলাকায় বন আগের অবস্থায় ফিরতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সময় নিচ্ছে। গবেষকেরা এই প্রবণতাকে ‘ক্রিটিক্যাল স্লোয়িং ডাউন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশেষ করে বনের মধ্যভাগ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সংকটটি বেশি প্রকট। এসব এলাকায় দুর্যোগের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে এবং পুনরুদ্ধারের গতি কমে যাচ্ছে।
সবচেয়ে কঠিন সময়
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল ছিল সুন্দরবনের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়। একের পর এক ঘূর্ণিঝড় সিডর, রেশমি ও আইলার আঘাতে বনের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০৯ সালের মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ এলাকা মাঝারি বা নিম্ন সহনশীলতায় নেমে আসে।
গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খুলনা ও শরণখোলা রেঞ্জের সমুদ্রমুখী অংশগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, এসব এলাকা সরাসরি লোনাপানির জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্র বাতাসের মুখে পড়ে। অন্যদিকে বনের উত্তরাংশ সমুদ্র থেকে ৭৫ থেকে ৯০ কিলোমিটার ভেতরে হওয়ায় এবং পশুর ও বলেশ্বর নদের মিঠাপানির প্রভাবে সেখানে পুনরুদ্ধার ক্ষমতা তুলনামূলক ভালো রয়েছে।
তবে কিছু এলাকায় ব্যতিক্রমও দেখা গেছে। চাঁদপাই রেঞ্জের দক্ষিণ-পূর্বাংশ এবং শরণখোলা রেঞ্জের শ্যালা নদীর তীরবর্তী এলাকায় পরিবেশ তুলনামূলক অনুকূল হলেও স্থিতিস্থাপকতা কমেছে। গবেষকদের মতে, সিডর, আইলা, মোরা, বুলবুল ও আম্পানের মতো ঘূর্ণিঝড়ের ধারাবাহিক আঘাত এসব এলাকাকে দুর্বল করে দিয়েছে।
গাছ, পানি ও মাটির ভূমিকা
গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব এলাকায় গাছ লম্বা ও ঘন, সেখানে ঝড়ের ক্ষতি তুলনামূলক কম হয় এবং বন দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। একইভাবে বড় ও প্রশস্ত পাতার গাছ বেশি শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম হওয়ায় দুর্যোগের পর পুনরুদ্ধারও দ্রুত হয়।
বৃষ্টিপাত ও মিঠাপানির প্রাপ্যতাও বনের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে মিঠাপানির প্রবাহ বজায় থাকে, সেখানে লবণাক্ততার প্রভাব কমে এবং বন দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়। কিন্তু উজানে বাঁধ নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে এই স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মাটির গুণগত মান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা। তাঁদের মতে, অতিরিক্ত ফসফরাস মাটির পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং গাছের শিকড়ের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে দুর্যোগের সময় গাছ সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মানবসৃষ্ট চাপ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, চিংড়ি চাষ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি সুন্দরবনের অখণ্ডতা ও উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। বনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী দীর্ঘদিন ধরে ‘আগা মরা’ রোগে আক্রান্ত। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও মিঠাপানির অভাব এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। শুধু সুন্দরী গাছের ক্ষতির কারণেই প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ক্ষতি হচ্ছে।
অথচ এই বনই প্রতিবছর প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার সমমূল্যের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতি ও ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে এই সক্ষমতা দিন দিন সীমিত হয়ে পড়ছে।
গবেষকদের সুপারিশ
গবেষক দলের প্রধান হংকং পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির জেসি স্টেম ল্যাব অব আর্থ অবজারভেশনসের গবেষক এম ডি মিজানুর রহমান ও তাঁর সহকর্মীরা মনে করেন, সুন্দরবন রক্ষায় এখনই বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে যেসব এলাকাকে পুনরুদ্ধার ক্ষমতাহীন ‘রেজিলিয়েন্স হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে নিবিড় নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি মিঠাপানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, মাটির গুণগত মান রক্ষা এবং উপগ্রহচিত্রের মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক নবীউল ইসলাম খান। তিনি বলেন, গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে সুন্দরবনের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও বনায়ন কর্মসূচি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ১৯৯৮ সাল থেকে গাছ কাটা বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনো কিছু অসাধু ব্যক্তি গোপনে বনাঞ্চলে ছোট গাছ কেটে নিচ্ছে, যা বনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততা বাড়ায় সুন্দরবনের পশুর ও সুন্দরীর মতো মূল্যবান গাছ কমে যাচ্ছে। ফারাক্কা ব্যারেজের পর পদ্মা ব্যারেজ নির্মিত হলে পানিপ্রবাহ কমে গিয়ে লবণাক্ততা আরও বাড়তে পারে; এ বিষয়ে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল। এই ঢাল দুর্বল হয়ে গেলে পুরো দেশ ঝুঁকির মুখে পড়বে। এই গবেষণা একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা—সুন্দরবন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ক্লান্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে আগে আমাদের ঘরের পাশের এই বনটিকে বাঁচাতে হবে। তা না হলে এর মূল্য দিতে হবে পুরো দেশকে।’



