বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবী ও চাঁদে অজস্র গ্রহাণুর পতনেই সৃষ্টি হয়েছে পানি এবং প্রাণের উপযোগী পরিবেশ। বিশেষ করে কার্বনসমৃদ্ধ গ্রহাণুগুলো পৃথিবীতে জীবনের উপযোগী রাসায়নিক ব্যবস্থা তৈরি করেছে। তবে চীনের চন্দ্রমিশন ছাং’এ-৬-এ পাওয়া নমুনা পরীক্ষার সাম্প্রতিক ফলাফল এই প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
চাঁদের মাটিতে মিলল নতুন তথ্য
চাঁদের মাটিতে পাওয়া অতিক্ষুদ্র ধাতব টুকরো পরীক্ষায় চীনা বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, পৃথিবীতে ভূত্বকের নড়াচড়া ও নানা ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় প্রাচীন গ্রহাণু আঘাতের বেশিরভাগ চিহ্ন মুছে গেছে। ফলে পৃথিবীতে পাওয়া উল্কাপিণ্ডের নমুনাগুলো সাধারণত গত প্রায় ২০ লাখ বছরের তথ্যই সংরক্ষণ করে।
চাঁদের নমুনা পরীক্ষায় চীনা বিজ্ঞানীরা ৪৩০ কোটি থেকে ২৮০ কোটি বছর আগের গ্রহাণুর আঘাতে সৃষ্ট পরিবর্তনগুলো পুনর্গঠন করেছেন। তাদের গবেষণার বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব জিওফিজিক্যাল রিসার্চ: প্ল্যানেটস-এর ২৭ এপ্রিলের সংখ্যায়।
চাঁদ: সৌরজগতের প্রাকৃতিক দিনলিপি
পৃথিবীতে বেশিদিন আগের তথ্য না থাকলেও চাঁদে ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপ কম। সেখানে প্রায় ৪০০ কোটি বছরের গ্রহাণু আঘাতের ইতিহাস সংরক্ষিত রয়েছে। তাই বিজ্ঞানীরা চাঁদকে সৌরজগতের এক ধরনের ‘প্রাকৃতিক দিনলিপি’ হিসেবে বিবেচনা করেন।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং চীনা বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির ভূতত্ত্ব ও ভূ-পদার্থবিদ্যা ইনস্টিটিউটের পোস্ট ডক্টরাল গবেষক লিউ সিয়াওইং বলেন, কোনও গ্রহাণু চাঁদে আঘাত করলে প্রচণ্ড তাপে সেটি বাষ্পে পরিণত হয় এবং সেখানে লোহা-নিকেলসহ ক্ষুদ্র ধাতব কণা রেখে যায়।
তিনি জানান, এসব ধাতব কণার রাসায়নিক গঠন চাঁদের নিজস্ব শিলার চেয়ে আলাদা। গ্রহাণুর ধরন অনুযায়ী এগুলোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ট্রেস উপাদান থাকে, যাকে ‘রাসায়নিক আঙুলের ছাপ’ এর সঙ্গে তুলনা করা যায়। এগুলো বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করে কোন ধরনের গ্রহাণু চাঁদে আঘাত করেছিল।
নমুনা বিশ্লেষণে চমক
এই পদ্ধতি ব্যবহার করে গবেষক দল ছাং’এ-৬ থেকে সংগৃহীত নমুনার মধ্যে থাকা আঘাতজনিত ধ্বংসাবশেষের ৪০টি কণা বিশ্লেষণ করেন। এর মধ্যে ১৩টি প্রাচীন চন্দ্র উচ্চভূমির শিলায় পাওয়া গেছে, যা প্রায় ৪৩০ কোটি বছর আগের আঘাতের রেকর্ড বহন করে। বাকি ২৭টি অপেক্ষাকৃত নতুন আগ্নেয় শিলার ধ্বংসাবশেষে সংরক্ষিত, যেগুলো প্রায় ২৮০ কোটি বছর আগের আঘাতের তথ্য দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাচীন ১৩টি নমুনার বেশিরভাগই সৌরজগতের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের পাথুরে গ্রহাণু ও লৌহসমৃদ্ধ উল্কাপিণ্ড থেকে এসেছে। সেখানে কার্বনসমৃদ্ধ গ্রহাণুর ধাতব অংশের হার ছিল ৮ শতাংশেরও কম।
গবেষকদের মতে, এটি ইঙ্গিত করে যে প্রায় ৪৩০ কোটি থেকে ২৮০ কোটি বছর আগে কার্বনসমৃদ্ধ গ্রহাণুর আঘাতের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল এবং এই পরিবর্তন ঘটেছিল এমন এক সময়ে, যখন সামগ্রিকভাবে গ্রহাণুর আঘাতের হার কমে আসছিল।
পানির উৎপত্তি তত্ত্বে নতুন ভাবনা
গবেষণার সহ-লেখক এবং চীনা বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির গবেষক লিন ইয়াংটিং বলেন, এই গবেষণা পৃথিবীর পানির উৎপত্তি সম্পর্কে বিদ্যমান তত্ত্বগুলোকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।
সূত্র: সিএমজি



