রাজবাড়ী জেলার পাংশায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রস্তাবটি নানা দিক থেকে পর্যালোচনার দাবি রাখে। এই ব্যারাজের মোট দৈর্ঘ্য হবে ২.১ কিলোমিটার, যেখানে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে (প্রতি স্পিলওয়ের দৈর্ঘ্য ১৮ মিটার ও প্রস্থ ১২ মিটার) এবং ১৮টি আন্ডারস্লুইস (প্রতি আন্ডারস্লুইসের দৈর্ঘ্য ১৮ মিটার ও প্রস্থ ১৪.৫ মিটার)। এছাড়াও থাকবে দুটি ফিশ পাস।
ব্যারাজের সম্ভাব্য সুবিধা ও উদ্বেগ
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পাংশা পর্যন্ত গঙ্গার পানির উচ্চতা প্রায় ১২ মিটার বজায় রাখা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সঞ্চয় করবে। এই পানি ব্যবহার করে হিমনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই প্রকল্পের নেতিবাচক দিকগুলোও রয়েছে, যা উপেক্ষা করা উচিত নয়।
পলিপতনের ঝুঁকি
২০১৬ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দাবি করা হয় যে ব্যারাজের কারণে উজানে পলিপতন বেশি হবে না এবং ৬০ বছরে নদীতল মাত্র ৩.২৮ ফুট বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ফারাক্কা ব্যারাজের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। ফারাক্কার উজানে গত ৫২ বছরে নদীতলের উচ্চতা কোথাও কোথাও প্রায় ২০ ফুট বেড়েছে। তাছাড়া, ব্যারাজে থাকা ১৮টি আন্ডারস্লুইসের মোট প্রশস্ততা মাত্র ২৬১ মিটার, যা ব্যারাজের মোট দৈর্ঘ্যের (২১০০ মিটার) মাত্র এক-অষ্টমাংশ। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায় যে কাগজের হিসাব বাস্তবে টেকে না; এই নির্গমনপথগুলো দ্রুত পলি দ্বারা রুদ্ধ হয়ে যেতে পারে এবং পানির নিচে থাকায় পরিষ্কার করাও কঠিন হবে।
পানি হ্রাসের প্রভাব
ভাটিতে পানির প্রবাহ হ্রাস একটি বড় উদ্বেগ। ব্যারাজের কারণে পাংশার পর নদীর পানির উচ্চতা বছরের বিভিন্ন মাসে মাত্র ১ থেকে ৫ মিটারে নেমে আসবে। এর ফলে পাংশা থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত নদ-নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির স্বল্পতা আরও বাড়বে, যা শস্য ও মৎস্য উৎপাদন হ্রাস করবে। গোয়ালন্দের পর যমুনার পানি যোগ হলেও, ভারতের নদী-সংযোগ প্রকল্প ও চীনের বাঁধ নির্মাণের কারণে যমুনার প্রবাহও হ্রাস পাচ্ছে। এতে ইছামতী, আড়িয়াল খাঁ ও অন্যান্য শাখা নদীর প্রবাহ কমে যাবে। শেষ পর্যন্ত মেঘনা মোহনায় পানি হ্রাস পেয়ে লবণাক্ততা দেশের আরও গভীরে প্রবেশ করবে, যা উত্তর-পূর্বের হাওর এলাকাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
বিকল্প কৌশল
গঙ্গানির্ভর এলাকার সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের উচিত ভিন্ন পথ গ্রহণ করা। এই কৌশলের দুটি দিক রয়েছে: আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ।
আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ
প্রথমত, বাংলাদেশকে ভারতের কাছ থেকে গঙ্গার ন্যায্য হিস্যা আদায়ের প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে। এর জন্য জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক নদী ব্যবহার সনদ স্বাক্ষর করা জরুরি। এই সনদ ভাটির দেশের স্বার্থ রক্ষা করে এবং ভারতের সাথে আলোচনায় বাংলাদেশকে নৈতিক ও আইনি শক্তি দেবে। দ্বিতীয়ত, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি ভাগাভাগি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নবায়ন আলোচনা শুরু করতে হবে। নতুন চুক্তিতে ন্যূনতম ৩৫ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহের গ্যারান্টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা সুন্দরবন রক্ষার জন্যও প্রয়োজন।
অভ্যন্তরীণ সংস্কার
দেশের অভ্যন্তরে নদ-নদীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। বেষ্টনী পদ্ধতির পরিবর্তে উন্মুক্ত পদ্ধতি গ্রহণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) পুনর্গঠন করতে হবে। সব নদ-নদীকে স্লুইসগেট, ফ্ল্যাপগেট, রেগুলেটর ও সংকীর্ণ সেতু থেকে মুক্ত করতে হবে। পোল্ডার উন্মুক্ত করে নদীর পানি অবাধে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে এবং জলাবদ্ধতা দূর করতে হবে। বাঁধগুলোকে অষ্টমাসি বাঁধে রূপান্তর করে গঙ্গার পানি সুন্দরবন হয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারে নদী পুনরুজ্জীবন সহায়ক হবে, যা অগভীর নলকূপভিত্তিক সেচের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই সংস্কারগুলো ৬৪ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে স্বল্প ব্যয়ে অধিক ফল দিতে পারে।
উপসংহার
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের নেতিবাচক প্রভাব, বিশেষ করে ভাটি অঞ্চলে, উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়া উচিত নয়। সরকারের উচিত আরও সময় নিয়ে জনগণের মতামত শোনা এবং বিকল্প কৌশল বিবেচনা করা। আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মাধ্যমে গঙ্গানির্ভর এলাকার পুনরুজ্জীবন সম্ভব, যা দেশের পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য কল্যাণকর হবে।



