শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকুগাঁও স্থলবন্দর এলাকায় গারো পাহাড়ের পাদদেশে বিস্তীর্ণ ধানখেতে স্থানীয় লোকজনের পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদে এক হাতি আহত হয়েছে। ঘটনাটি গত বৃহস্পতিবারের। বন থেকে নেমে আসা এক পাল হাতির একটি সদস্য ধানখেতে পাতা তামার জিআই তারে জড়িয়ে লুটিয়ে পড়ে। আহত হাতির তড়পানোর দৃশ্য দেখে উল্লাস করে উপস্থিত লোকজন।
স্থানীয়দের বাধায় উদ্ধার ব্যর্থ
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এসব বৈদ্যুতিক ফাঁদ উচ্ছেদ করতে গেলে স্থানীয় লোকজনের বাধার মুখে পড়তে হয়। তাঁদের অভিযোগ, নোয়াবিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. মান্নান স্থানীয় লোকজনকে প্ররোচিত করে বনকর্মীদের ওপর হামলা করান। বৃহস্পতিবার হাতি হত্যাচেষ্টার সময় ঘটনাস্থলে ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য উপস্থিত ছিলেন। 'এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের' (ইআরটি) সদস্যরা হাতিদের নিরাপদে ফেরাতে তৎপর হতে পারেননি স্থানীয় লোকজনের বাধার কারণে।
নোয়াবিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, নাকুগাঁও বন্দরের পশ্চিমে ৩০০-৪০০ একর জমিতে ধান চাষ হয়। হাতি তাড়াতে স্থানীয় লোকজন জেনারেটর দিয়ে বাতি জ্বালান। মাঝেমধ্যে কৃষকেরা সেসব জেনারেটর দিয়ে বৈদ্যুতিক তারে সংযোগ দেন। তবে তিনি তার সহযোগিতায় এসব তারে বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং বনকর্মীদের ওপর হামলার বিষয়টিও অস্বীকার করেন। ইউপি সদস্য মো. মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
১০ বছরে ৩২ হাতি হত্যা
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও জামালপুরে ৩২টি হাতি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে মাত্র সাতটি এবং থানায় মামলা হয়েছে একটি। বন আদালতে মামলা হয়েছে একটি।
শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার বন বিভাগের রেঞ্জ অফিসার দেওয়ান আলী বলেন, যত দিন ধান কাটা হয়নি, তত দিন সবাই মিলে হাতি তাড়াতেন। এখন ধান অর্ধেক কাটা হয়ে গেছে, অন্যরা একা হয়ে গেছেন। ফলে তাঁরা ধান বাঁচাতে জিআই তার দিয়ে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতছেন। বৃহস্পতিবারের ফাঁদ উচ্ছেদে গেলে বন বিভাগের লোকজনকে অবরুদ্ধ করে রাখে স্থানীয় লোকজন। তিনি আরও বলেন, বন্য প্রাণী ফসলের ক্ষতি করলে সরকার ক্ষতিপূরণ দেয়; কিন্তু ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় অনাগ্রহ স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাঁরা তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ চান, এক-দেড় মাস অপেক্ষা করতে চান না। গত সপ্তাহেও বন বিভাগের পক্ষ থেকে ফসলের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৮ লাখ ৫৯ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
হাতি হত্যার শাস্তি
সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া বন্য প্রাণী (নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ) আইন-২০২৬-এর তফসিল-১-এর (ক) অনুযায়ী, হাতিকে পরিবেশের সূচক (ফ্ল্যাগশিপ স্পেসিস) হিসেবে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। হাতি হত্যা আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য অপরাধ। আইন অনুযায়ী, লাইসেন্স ছাড়া হাতি হত্যা করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য সর্বনিম্ন দুই বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে অপরাধীর সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড এবং ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান কার্যকর হবে। আইনের ৩৭ ধারায় আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন বন অপরাধীকে আদালতের পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।
এক দশকে বৈদ্যুতিক ফাঁদে ২৬ হাতি হত্যা
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের তালিকায় হাতিকে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা বন্য প্রাণী হিসেবে মহাবিপন্ন ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ২০১৬ সালে। ওই সময় আইইউসিএনের এক জরিপে বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা নির্ণয় করা হয়েছিল ২৬৮টি। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নিহত হাতির সংখ্যা ১৪৬। এর মধ্যে ২৬টি হাতিকে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে হত্যা করা হয়েছে। শুধু শেরপুর নয়, জামালপুর, ময়মনসিংহ, রাঙামাটি, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে হাতি হত্যায় বৈদ্যুতিক ফাঁদের ব্যবহার বাড়ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হাতিবিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ বলেন, কৃষকের সারা বছরের কষ্টের ফসল যেমন বাঁচাতে হবে, একইভাবে হাতিকেও রক্ষা করতে হবে। শেরপুরে বনাঞ্চলের তুলনায় হাতির সংখ্যা বেশি। কিন্তু সে তুলনায় বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দেখা যায় না। কোনো ঘটনা ঘটলে কিছু পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়। স্থানীয় লোকজনকে বছরব্যাপী সচেতন করে তোলা এবং হাতিকে বনে ফেরাতে ইআরটি সদস্যদের সক্ষম করে গড়ে তোলার ওপর বন বিভাগকে কাজ করে যেতে হবে।



