মতুয়া সম্প্রদায়ের নাগরিকত্ব নিয়ে উদ্বেগ, আশ্বাস মন্ত্রীর
মতুয়া সম্প্রদায়ের নাগরিকত্ব উদ্বেগ, আশ্বাস মন্ত্রীর

বাংলাদেশ থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মতুয়া সম্প্রদায়ের যেসব মানুষ ভারতে এসেছিলেন, তাদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ নয় বরং ‘শরণার্থী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে দিয়ে আসছে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। তবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরও মতুয়া সম্প্রদায়ের অনেকের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে—তারা আদৌ ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন কি না, তা নিয়ে। এই অনিশ্চয়তার জন্ম হয়েছে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সাম্প্রতিক এক ঘোষণাকে ঘিরে।

মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় শঙ্কা

সরকার গঠনের পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছেন যে বাংলাদেশ থেকে আসা ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ রাজ্য পুলিশ আটক করে বিএসএফের হাতে তুলে দেবে, যাতে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো যায়। তিনি বলেন, ‘যারা ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে এসেছেন, কিন্তু নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন সিএএ-এর আওতায় পড়েন না, তারা পুরোপুরি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। তাদের সরাসরি রাজ্য পুলিশ গ্রেপ্তার করবে, আটক করবে এবং বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেবে। বিএসএফ বিডিআরের (বিজিবির পুরোনো নাম) সঙ্গে কথা বলে তাদের ডিপোর্ট করার ব্যবস্থা করবে। অর্থাৎ ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট।’

ওই ঘোষণায় এটা স্পষ্ট নয় যে ‘সিএএ-এর আওতায় পড়েন না’—এই কথাটির অর্থ কী। নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় যাদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের একটি বড় অংশই মতুয়া সম্প্রদায়ের। তাই মতুয়ারা উদ্বিগ্ন যে তাদেরও কি বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে কথিত অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মন্ত্রীর আশ্বাস

সোমবার মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ও পশ্চিমবঙ্গের ক্যাবিনেট মন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়ার সঙ্গে বৈঠকে বসেন প্রায় একশো মতুয়া মানুষ। বৈঠকের পরে মন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া বলেন, ‘মতুয়া সম্প্রদায়ের কোনো উদ্বাস্তু মানুষ, যারা ২০২৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতে এসেছেন, তাদের কাউকে ফের উদ্বাস্তু হতে হবে না। আমি মতুয়াদের বলেছি, আপনাদের প্রতিনিধি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করুন ও আপনাদের দাবি তুলে ধরুন।’

মতুয়াদের ‘ধর্মগুরু’ ঠাকুর পরিবারের সদস্য ও বিজেপির বিধায়ক সুব্রত ঠাকুর বলেছেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-নেত্রীরা এবং আমাদের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানুষকে অনেক ভুল বুঝিয়েছিলেন। সিএএ-তে আবেদন করা নিয়ে মানুষের মনে ভয়ের সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু মানুষ সত্য বুঝতে পেরেছেন, তাই আজ আবার মতুয়াদের অনেকেই সিএএ-র মাধ্যমে নাগরিকত্বের আবেদন করছেন।’ তিনি নিজেও সিএএ ক্যাম্প চালু করেছেন এবং এসআইআর-এর সময়েও মানুষকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানান।

সিএএ-এর শর্ত ও জটিলতা

ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান থেকে হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি এবং খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ ২০২৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বরের আগে ভারতে এলে নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারবেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ এই আইনের আওতায় পড়েন না।

সিএএ-এর তালিকাভুক্তি পর্ব চলার সময় পশ্চিমবঙ্গের ঠাকুরনগরে বিজেপির পৃষ্ঠপোষকতায় সহায়তা শিবির গড়ে উঠেছিল। সেখানে সিএএ-এর অনলাইন আবেদন ও প্রয়োজনীয় হলফনামা এবং মতুয়া ঠাকুরবাড়ির উদ্যোগে হিন্দু সনদ ও মতুয়া সনদ সংগ্রহের জন্য ৮০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছিল। মতুয়াদের বক্তব্য ছিল, এই সনদগুলো তাদের অধিকার নিশ্চিত করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

তবে গত ৯ই ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ দেয় যে, সিএএ-এর আওতায় অধিকার প্রদান নির্ভর করবে আবেদনকারীর ধর্মীয় নিপীড়নের হাত থেকে পালিয়ে আসার দাবির সত্যতা যাচাইয়ের ওপর। অর্থাৎ, মতুয়া সমাজের সদস্যদের ভারতীয় নাগরিকত্ব পেতে বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হওয়ার প্রমাণ দেওয়া বাধ্যতামূলক।

বাস্তব দুশ্চিন্তা

ঠাকুরনগরের বাসিন্দা একজন মতুয়া ব্যক্তি বলেছেন, ‘বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর মানুষ আবার সজাগ হয়েছেন। অনেকেই বিশ্বাস করেন হয়তো এবার কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্মিলিত উদ্যোগে নাগরিকত্বের সমস্যা মিটবে। কিন্তু বিজেপি তাদের প্রতিশ্রুতি রাখবে কি না, সেটা সময় বলবে।’

তৃণমূল কংগ্রেসপন্থি মতুয়া নেতা সঞ্জয় বিশ্বাস বলছেন, ‘বাংলাদেশের জমির দলিল অনেকের কাছেই নেই। সেটা সিএএ-এর আবেদনে বড় সমস্যা। অনেক আবেদনকারী আবার তাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্র জমা দিতে চাইছেন না।’ তিনি আরও জানান, ‘মানুষের মনে বিভ্রান্তি অনেক। এখন এমন পরিস্থিতি যে সিএএ-এর মাধ্যমে নাগরিকত্বের আবেদন না করলে হয়তো ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেবে বা বাংলাদেশে পুশব্যাক করে দেবে। যারা নাগরিকত্ব পাননি এবং যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে এসআইআর-এর সময়ে বাদ গিয়েছে, তাদের মনে আরও বেশি ভয়।’

মতুয়া ও দলিত অধিকার নেতা সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস বলছিলেন, ‘সিএএ-এর অধীনে নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য যে সব তথ্যপ্রমাণ ও কাগজপত্র দরকার, তা অধিকাংশ মানুষের কাছেই নেই। ফলে ভবিষ্যতে ভুয়া নথি তৈরি করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে।’ তিনি আরও জানান, ‘সিএএ-এর অধীনে নাগরিকত্ব পেতে আবেদনকারীকে প্রথমে নিজেকে বাংলাদেশি নাগরিক বলে প্রমাণ করতে হবে। ফলে, পরবর্তীকালে যদি আবেদন গৃহীত না হয়, তাহলে তিনি সিএএ থেকে বাদ পড়বেন ও “অনুপ্রবেশকারী” বলে বিবেচিত হতে পারেন।’

নাগরিকত্ব প্রাপ্তির সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা

এখনো পর্যন্ত কতজন সিএএ-র অধীনে নাগরিকত্ব পেয়েছেন, সে ব্যাপারে স্পষ্ট তথ্য নেই। রাজ্যসভায় ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই বলেন, সিএএ-র অধীনে ‘হাজার হাজার মানুষ’ নাগরিকত্ব পেয়েছেন। তবে এর আগে তৃণমূল কংগ্রেস সংসদ সদস্য সুস্মিতা দেব রাজ্যসভায় দাবি করেন, মাত্র ৩৫০ জন মানুষ সিএএ-র মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেয়েছেন।