মুসলমানদের ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী কোরবানির ঈদে গরু কোরবানি দেওয়া ও গরুর মাংস খাওয়া খুবই সাধারণ বিষয়। তাই ঈদ যত কাছে আসে, গরুকে ঘিরে আলোচনা, বিতর্ক ও আবেগও বাড়তে থাকে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর কোরবানি ও গরুর মাংস নিয়ে সেখানে যে কড়াকড়ি বেড়েছে, তা অনেক মুসলমানের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের ‘মাংসের রাজনীতি’ তাই এখন আর শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়, এটি পুরো ভারত-বাংলাদেশ অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক বাস্তবতার প্রতিফলন। কারণ দুই দেশের ধর্মীয় আবেগ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া গভীরভাবে একে অন্যের সঙ্গে জড়িত। ভারতে মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের খবর বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় তৈরি করে, আবার বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ভারতে মুসলমানবিদ্বেষী রাজনীতিকে আরও উসকে দেয়। ফলে দুই দেশের উগ্রবাদ যেন একে অন্যকে শক্তি জোগায়।
ধর্ম রাজনীতির হাতিয়ার
বাংলাদেশে ধর্ম অনেক আগেই রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এখন ভারতেও একই প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে বিজেপির দীর্ঘ উত্থান এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিস্তার দেশটির সামাজিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এনেছে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ‘মাংসের রাজনীতি’ সেই পরিবর্তনেরই একটি প্রকাশ। বাইরে থেকে এটি কেবল কোরবানি বা গরু জবাইয়ের বিতর্ক মনে হলেও ভেতরে এটি রাষ্ট্র, ধর্ম ও সামাজিক সহাবস্থানের সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে।
কাগজে-কলমে ভারতের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো—গত দেড় দশকে দেশটির রাজনৈতিক ভাষা ক্রমেই ধর্মীয় পরিচয়নির্ভর হয়ে উঠেছে। ‘গো-রক্ষা’, ‘লাভ জিহাদ’, ‘ঘর ওয়াপসি’, ‘দেশদ্রোহী’, ‘পাকিস্তানের দালাল’—এসব শব্দ কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এগুলো এখন সামাজিক বিভাজনের অস্ত্র। বজরং দল, আরএসএস বা উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড বহুদিন ধরেই উদ্বেগের কারণ। কখনও গরুর মাংস রাখার অভিযোগে, কখনও গরু পরিবহনের সন্দেহে, আবার কখনও শুধু মুসলিম পরিচয়ের কারণেই মানুষকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। উত্তর প্রদেশের দাদরিতে আখলাক হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড, হরিয়ানার বহু ঘটনা আজও মানুষের মনে আতঙ্কের স্মৃতি হয়ে আছে।
সমস্যা হলো, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন সহিংসতা হিসেবেই আর দেখা যাচ্ছে না। বরং ধীরে ধীরে এগুলো এক ধরনের সামাজিক স্বাভাবিকতায় পরিণত হচ্ছে। ঘটনা ঘটার পর রাষ্ট্র তদন্ত করে, ক্ষোভ প্রকাশ করে, কিন্তু এর মধ্যেই সমাজে ভয় ও বিভাজনের বীজ বপন হয়ে যায়। মুসলমানদের মনে এই বার্তা পৌঁছে যায় যে তারা সবসময় সন্দেহের তালিকায় আছে।
পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তিত চিত্র
পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের তুলনামূলক উদার ও বহুত্ববাদী রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসন এবং পরে তৃণমূল কংগ্রেসের আমলেও ধর্মীয় উত্তেজনা পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল না, কিন্তু সামাজিক সহাবস্থানের একটা ভারসাম্য ছিল। কলকাতার রাস্তায় গরুর মাংসের কাবাব যেমন পাওয়া যেত, তেমনই দুর্গাপূজার আনন্দেও মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল স্বাভাবিক দৃশ্য।
কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই ভারসাম্য নড়বড়ে হয়ে গেছে। বিজেপির উত্থান পশ্চিমবঙ্গে কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন। কোরবানির ঈদের আগে ১৯৫০ সালের পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ তাই অনেকের কাছে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই বেশি প্রতীয়মান হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন ঠিক ঈদের আগে? কেন হঠাৎ ৭৬ বছরের পুরোনো আইন নতুন করে সক্রিয় হলো? রাজনীতিতে সময়টাই আসলো। ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’—এই কৌশলেই ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করা হয়। সরকার সরাসরি কোরবানি নিষিদ্ধ বলেনি, কিন্তু এমন শর্ত আর বিধিনিষেধ তৈরি করেছে, যাতে সাধারণ মানুষ ভয় পায়, ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে যায় এবং ধর্মীয় অনুশীলন অনিশ্চয়তায় পড়ে।
অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও রাজনৈতিক অগ্নি
এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি কিন্তু শুধু মুসলমানদের নয়। বিপদে পড়েছেন হিন্দু খামারিরাও। এটাই এই রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ। পশ্চিমবঙ্গে গরুর খামারের বড় অংশের মালিক হিন্দুরা। তারা বছরের পর বছর গরু লালন-পালন করেন, দুধ বিক্রি করেন, তারপর বয়স্ক গরু বিক্রি করে নতুন গরু কেনেন। এই পুরো অর্থনৈতিক চক্রের বড় ক্রেতা মুসলিম সমাজ, বিশেষত কোরবানির ঈদকে ঘিরে।
অর্থাৎ একদিকে মুসলমানরা ধর্মীয় কারণে পশু কেনেন, অন্যদিকে হিন্দু খামারিরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হন। এটি কেবল ধর্মীয় সম্পর্ক নয়, এটি একটি পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরতা। কিন্তু রাজনীতির আগুনে সেই সম্পর্কই এখন ঝুঁকির মুখে।
বাংলাদেশের প্রভাব
বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর। কারণ এখানে ভারতীয় ঘটনাবলির সরাসরি সামাজিক প্রতিক্রিয়া হয়। গত এক দশকে বাংলাদেশে যত বড় সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে, তার অনেকগুলোর পেছনেই ছিল ভারতের ঘটনা বা ভারত-সম্পর্কিত উত্তেজনা।
২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর ঘিরে সহিংসতা, কুমিল্লার পূজামণ্ডপে কোরআন রাখার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা, কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভারতে মুসলমান নির্যাতন’ নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে সংখ্যালঘুদের টার্গেট করার প্রবণতা—এসবই দেখিয়েছে দুই দেশের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি একে অপরকে উসকে দেয়।
বাংলাদেশে এক ধরনের ভারতবিরোধী আবেগ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে ভারতে মুসলমান নির্যাতনের খবর এলে কিছু গোষ্ঠী সেটিকে এখানে হিন্দুদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের অজুহাত বানানোর চেষ্টা করে। তখন সাধারণ হিন্দু পরিবারগুলো আতঙ্কে পড়ে। অনেক এলাকায় মন্দির পাহারা দিতে হয়, বাড়িঘর রক্ষায় স্থানীয় মুসলমানদেরও এগিয়ে আসতে হয়।
অর্থাৎ ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদ এবং বাংলাদেশের উগ্র সাম্প্রদায়িকতা—দুটোই পরস্পরের খাদ্য। একপক্ষের উন্মাদনা অন্যপক্ষের চরমপন্থাকে শক্তিশালী করে। মাঝখানে পিষ্ট হয় সাধারণ মানুষ।
প্রতিনিধিত্ব বনাম নিরাপত্তা
অনেকে যুক্তি দেন, ভারতে মুসলমানরা এখনও রাষ্ট্রপতি হন, বিচারপতি হন, সংসদ সদস্য হন—তাই পরিস্থিতি এতটা খারাপ নয়। কিন্তু প্রতিনিধিত্ব থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ আমলেও কিছু কৃষ্ণাঙ্গ উচ্চপদে ছিলেন, তাই বলে কি বৈষম্য ছিল না? রাষ্ট্রের ভাষা ও সামাজিক মনোভাব যদি এক সম্প্রদায়কে ‘আলাদা’ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে, তাহলে ধীরে ধীরে তাদের নাগরিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই বিভাজনকে এখন ক্রমেই রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ ধর্মীয় মেরুকরণ ভোটের রাজনীতিতে কার্যকর অস্ত্র হয়ে উঠেছে। মানুষ যখন বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, কৃষি সংকট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুরবস্থা কিংবা ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে, তখন তাদের সামনে নতুন করে ধর্মীয় আবেগের ইস্যু ছুড়ে দেওয়া হয়। ফলে গরিব হিন্দু ও গরিব মুসলমান—যাদের প্রকৃত সংকট প্রায় একই—তারা নিজেদের বাস্তব সমস্যার বদলে একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। রাজনৈতিক শক্তিগুলোও জানে, ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষোভকে অর্থনীতির বিরুদ্ধে নয়, পরিচয়ের রাজনীতির দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারলে ক্ষমতা ধরে রাখা সহজ হয়।
ভারতের বৈচিত্র্যের ভবিষ্যৎ
পশ্চিমবঙ্গের ‘মাংসের রাজনীতি’ তাই কেবল খাদ্যাভ্যাস বা ধর্মীয় আচারের প্রশ্ন নয়। এটি বহুত্ববাদ বনাম ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের সংঘর্ষ। এটি রাষ্ট্রের চরিত্র ধীরে ধীরে বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত। এটি সেই বাস্তবতা, যেখানে নাগরিক পরিচয়ের চেয়ে ধর্মীয় পরিচয় বড় হয়ে উঠছে, আর সাংবিধানিক অধিকারের চেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আজ গরুর মাংস নিয়ে বিতর্ক, কাল হয়তো পোশাক, ভাষা, নাম বা সংস্কৃতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হবে। কারণ পরিচয়ের রাজনীতি একবার শক্তিশালী হয়ে উঠলে তার সীমা ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত হয়।
অথচ গোটা বিশ্বের কাছে ভারতের সবচেয়ে বড় পরিচিতি ও শক্তি ছিল তার বৈচিত্র্য। শত ভাষা, শত ধর্ম, শত সংস্কৃতি, অসংখ্য খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচার মিলিয়েই এই সভ্যতা দাঁড়িয়ে ছিল। ভারতকে আলাদা করেছে তার সহাবস্থানের ঐতিহ্য—যেখানে একই শহরে মসজিদের আজান, মন্দিরের ঘণ্টা, গির্জার প্রার্থনা ও গুরুদুয়ারার সংগীত পাশাপাশি টিকে থেকেছে। যদি সেই ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু মুসলমান বা হিন্দুরা নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো সমাজ, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ পেটের দায়ে বাঁচে, নিরাপত্তা ও শান্তির আশায় বাঁচে। ধর্ম মানুষকে নৈতিক শক্তি, আত্মিক সান্ত্বনা ও মানবিক মূল্যবোধ দিতে পারে, কিন্তু সেটিকে যখন রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করা হয়, তখন সেটিই সমাজকে বিভক্ত ও সহিংস করে তোলে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, বিভেদের রাজনীতি দিয়ে সাময়িক বিজয় অর্জন করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা সমাজকে এমন ক্ষত দেয়, যার দাগ প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করতে হয়। সাম্প্রদায়িক ঘৃণা একবার স্বাভাবিক হয়ে গেলে তার আগুন কোনও এক সম্প্রদায়ের ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকে না, শেষ পর্যন্ত তা পুরো সমাজকেই গ্রাস করে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট



