বকুলা বেগম। রাজধানীর পল্লবীর কালশী বস্তিতে বসবাস করেন। সোমবারের (২৫ মে) আগুন তার সব কেড়ে নিয়েছে। সে কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, সাত বছর ধরে পরিবার নিয়ে এই বস্তিতে থাকি। আগুনে সব পুড়ে গেছে। বিধবা ভাতার টাকা সংগ্রহ করে ঘরে রাখছিলাম, খরচও করতে পারি নাই। এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হই। আমরা গরিব মানুষ, ঈদের সময় বাসায় বাসায় গিয়া মাংস টুকাই। ওই মাংস দিয়া দুই দিন ভালোভাবে খাই। এবার সব শেষ। মাংস আইনা রান্না করমু কই? মাথার ওপর কোনও ছাদ নাই। আমাগো ঈদ এইবার খোলা আসমানের নিচে।
শতাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত
কালশী বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে বকুলা বেগমের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শতাধিক পরিবার। তারা এখন খোলা আকাশের নিচে বাস করছে। আগুন তাদের বসতভিটাসহ সবই কেড়ে নিয়েছে। দেশে যখন পবিত্র ঈদুল আজহার প্রস্তুতি চলছে, তখন সব হারিয়ে অসহায় কালশী বস্তিবাসী। তাদের ঈদের খুশি বদলে গেছে কান্নায়। মঙ্গলবার (২৬ মে) দুপুরে বস্তিতে গিয়ে দেখা গেছে, আগুনে সব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসী। পোড়া ধ্বংসস্তূপের ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে টিন, কাঠ, কাপড় আর ভাঙাচোরা নানা সামগ্রী।
ক্ষতিগ্রস্তদের করুণ অবস্থা
ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীর কেউ পোড়া ঘরের ভেতর থেকে বেঁচে থাকা কোনও জিনিস উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। কেউ আবার পোড়া টিনসহ ঘরের নানা সামগ্রী কুড়িয়ে জড়ো করছেন। কেউবা জড়ো করা পোড়া জিনিস ভাঙারির দোকানে নিয়ে বিক্রি করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসী মো. নবাব জানান, আগুনের লেলিহান শিখা তার ১৫টি ঘর ও একটি মুদি দোকান কেড়ে নিয়েছে। তিনি বলেন, এই শহরে ২০ বছর ধইরা যা উপার্জন করেছি, সব এক আগুনে শেষ। দোকানে কয়েক লাখ টাকার মাল ছিল, সব পুড়ে গেছে।
ঈদের প্রস্তুতি শূন্য
আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, প্রতি বছর কোরবানি দেই। কয়েকজন মিলে আজ গরু আনার কথা ছিল। কিন্তু এখন থাকার জায়গাই নাই। ঈদের দিন রাস্তায় ঘুমাইতে হইবো। আমাদের এবারের ঈদ নেই। আমেনা বেগম নামে এক নারী বলেন, আমার দোকান ছিল। মাগরিবের আজানের পরে বাসায় গিয়েছিলাম। ছোট ছেলের ফোনে দোকানে আগুন লাগার খবর পাই। আইতে আইতে দেখি সব শেষ। কিছুই বাইর করতে পারি নাই। লাল মিয়া নামে আরেক দোকানি বলেন, আমার প্লাস্টিকের দোকানে ৫০ লাখ টাকার বেশি মালামাল ছিল। নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম। এর মধ্যে আগুন লাগে। ফিরে এসে দেখি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমার আর কিছুই রইলো না।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সন্দেহজনক
বস্তিবাসীর অভিযোগ, সোমবার বিকালে বস্তির এক দোকানের সঙ্গে স্থানীয় এক যুবকের ঝগড়া হয়। ওই যুবক অগ্নিকাণ্ডের হুমকি দিয়েছিল। এরপর বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করে। পুলিশ হেফাজতে নিয়ে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। বর্তমানে ওই যুবক পুলিশ হেফাজতেই আছে। এ বিষয়ে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তি আগুন দেওয়ার কথা স্বীকার করেনি। তবে কিছু প্রমাণ থেকে আমাদের ধারণা, ওই যুবকই আগুন দিয়েছে। এ বিষয়ে মামলা হচ্ছে। মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হবে।
ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতা
উল্লেখ্য, সোমবার সন্ধ্যায় বস্তিটিতে আগুন লাগে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। নির্বাপণ করে রাত সাড়ে ৩টার দিকে। আগুনে কোনও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।



