চীনে মরুভূমিকে উর্বর মাটিতে রূপান্তরের অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন
মরুভূমিকে সুজলা-সুফলা ভূমিতে পরিণত করা দীর্ঘদিন ধরে বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে চীনের শাপোতৌ ডেজার্ট এক্সপেরিমেন্টাল রিসার্চ স্টেশনের গবেষকেরা এই অসাধ্য কাজটি সম্পন্ন করার জন্য একটি অভাবনীয় পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। বিশেষ ধরনের অণুজীব সায়ানোব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে তাঁরা মাত্র ১০ মাসের মধ্যে অনুর্বর ও অস্থির বালুরাশিকে উৎপাদনশীল উর্বর মাটিতে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন।
সায়ানোব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে জৈব মৃত্তিকা স্তর তৈরি
সায়ানোব্যাকটেরিয়া হলো একধরনের সালোকসংশ্লেষণকারী অণুজীব, যা গবেষকেরা ব্যবহার করে একটি ‘বায়োলজিক্যাল সয়েল ক্রাস্ট’ বা জৈব মৃত্তিকা স্তর তৈরি করেছেন। মরুভূমির যে বালু বাতাসের তোড়ে সারাক্ষণ স্থান পরিবর্তন করে, এই স্তর সেই বালুর ওপর একটি জীবন্ত পর্দার মতো কাজ করে। বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যখন জৈব স্তরটি বালুর ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন সায়ানোব্যাকটেরিয়া চিনিভিত্তিক একধরনের আঠালো পদার্থ নিঃসরণ করে। এই আঠা বালুর প্রতিটি কণাকে একে অপরের সঙ্গে শক্তভাবে আটকে দেয় এবং একটি স্থিতিশীল ও কঠিন স্তরে পরিণত করে। প্রাকৃতিক উপায়ে মাটি তৈরি হতে যেখানে দীর্ঘ সময় লাগে, এই পদ্ধতিতে সে সময় কয়েক গুণ কমে আসে।
পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি ও পরিবেশবান্ধব ভিত্তি
এই প্রক্রিয়ার ফলে বালুর পুষ্টিগুণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের মতো প্রয়োজনীয় উপাদানের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। এই জৈব স্তর বালুকে আটকে রাখে এবং মরুভূমির তীব্র তাপেও বালুর ভেতর আর্দ্রতা ধরে রাখতে সক্ষম। ফলে চরম শুষ্ক পরিবেশেও গাছপালার বেঁচে থাকার জন্য এটি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ভিত্তি তৈরি করে। গবেষক দলটির মতে, সায়ানোব্যাকটেরিয়া গবেষণাগারেই চাষ করা সম্ভব। এসব অণুজীব চরম শুষ্কতা সহ্য করতে পারে এবং সামান্য পানির সংস্পর্শে এলেই দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে একটি শক্তিশালী স্তর তৈরি করে, যা বায়ুপ্রবাহের ফলে সৃষ্ট ভূমিক্ষয় রোধ করে।
গবেষণার ফলাফল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
কৃত্রিম জৈব মৃত্তিকা স্তর আসলে পলিস্যাকারাইড নিঃসরণের মাধ্যমে মাটির কণাগুলোকে একত্রে ধরে রাখে। সমীক্ষা বলছে, প্রাকৃতিকভাবে মাটি তৈরির প্রক্রিয়ার চেয়ে এই পদ্ধতিতে অর্গানিক কার্বন বা জৈব কার্বন জমা হওয়ার হার ৩ দশমিক ২ গুণ এবং নাইট্রোজেন জমা হওয়ার হার প্রায় ১৫ গুণ বেশি। একবার এই বালুর আস্তরণ রাসায়নিক ও ভৌত প্রক্রিয়ায় স্থিতিশীল হয়ে গেলে, সেখানে লিকেন ও শেওলার মতো আরও জটিল প্রাণের বিকাশ সহজ হয়ে ওঠে। মার্কিন ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের গবেষণায়ও এই তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে।
ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে মরুভূমিতে গাছ লাগানো অত্যন্ত শ্রমসাধ্য ও ব্যয়বহুল। তবে এই নতুন প্রযুক্তি সে ধারা বদলে দিতে পারে। খরাপ্রতিরোধী এসব ব্যাকটেরিয়ার জাত বিশ্বের যেকোনো শুষ্ক অঞ্চলের জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম অণুজীব সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করছেন। এর উদ্দেশ্য হলো, নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার জাতকে আরও উন্নত করা, যাতে আরও দ্রুত মাটির স্তর তৈরি করা যায়। ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির মাধ্যমে বড় আকারে এই ডেজার্ট কন্ট্রোল সিস্টেম ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বিজ্ঞানীদের।



