বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভূমিকা ও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার দ্বৈত বাস্তবতা
বর্তমান বিশ্বে স্বাস্থ্য একটি জটিল ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে, যেখানে মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন, অপুষ্টি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা একত্রিত হয়ে মানবজাতির সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা কঠিন দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রধান অভিভাবক হিসেবে কাজ করে চলেছে। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থার মূল লক্ষ্য হলো 'সব মানুষের সর্বোচ্চ সম্ভব স্বাস্থ্যমান নিশ্চিত করা,' যেখানে স্বাস্থ্যকে কেবল রোগমুক্ত অবস্থা নয়, বরং শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার সমন্বিত অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ
WHO-এর কার্যক্রম নিম্নলিখিত উদ্দেশ্যগুলোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়:
- স্বাস্থ্যসেবার সমতা নিশ্চিত করা: সংস্থাটি বিশ্বাস করে যে স্বাস্থ্যসেবা কোনো পণ্য নয়, বরং এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম নির্বিশেষে সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
- রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ: সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় WHO বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করে, যেমন পোলিও নির্মূল, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ, এবং সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারির সময় বৈশ্বিক সমন্বয়।
- জরুরি স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদান: প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ বা মহামারির সময় WHO দ্রুত জরুরি সহায়তা প্রদান করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পুনর্বাসনে কাজ করে।
- স্বাস্থ্য গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ: সংস্থাটি বিশ্ব জুড়ে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে, যা নীতিনির্ধারকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করে।
- মানসম্মত ওষুধ ও টিকার নিশ্চয়তা: WHO ওষুধ ও টিকার মান নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যাতে মানুষ নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা পেতে পারে।
- স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি: জনসাধারণকে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করতে সংস্থাটি বিভিন্ন প্রচারণা চালায়, যেমন বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞান বৃদ্ধি করা।
বর্তমান বিশ্বে স্বাস্থ্য কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি একটি বৈশ্বিক ইস্যু, যেখানে এক দেশের রোগ দ্রুত অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই মানবজাতির টেকসই উন্নয়নের জন্য সুস্বাস্থ্য অপরিহার্য, এবং কেবল WHO-এর একার পক্ষে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই 'সবার জন্য স্বাস্থ্য' স্বপ্নটি বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ
অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়, এবং WHO-এর নেতৃত্বে বিশ্ব কিছু ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে, যেমন গুটিবসন্ত সম্পূর্ণ নির্মূল এবং পোলিও নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো। বাংলাদেশকে WHO টিকাদানে 'High Performing Country' হিসেবে উল্লেখ করেছে, যার মূল চালিকাশক্তি হলো কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা এবং এনজিওগুলোর ভূমিকা। প্রায় ১৩ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে, যেখানে প্রতি ৬ হাজার মানুষের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা, টিকা এবং মাতৃসেবা প্রদানের ব্যবস্থা আছে। এছাড়া, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যেমন টেলিমেডিসিন, মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা এবং ই-হেলথ রেকর্ডের বিস্তার।
তবে, এসব অর্জন সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। সরকারি হাসপাতালে ভিড়, বেসরকারি হাসপাতালে আকাশছোঁয়া খরচ এবং চিকিৎসা নিতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়া পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাস আলোচনার কেন্দ্রে রয়ে গেছে। WHO বহুবার বলেছে যে 'Universal Health Coverage' নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়, কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা এখনো সেই লক্ষ্যের অনেক দূরে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সংকটসমূহ
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় দীর্ঘদিন ধরেই কম, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশেরও নিচে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। এই সীমিত বিনিয়োগের ফলে হাসপাতালের অবকাঠামো দুর্বল থাকে, চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি দেখা যায় এবং জনবলসংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর হাজার হাজার পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে, এবং WHO ও বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুসারে বাংলাদেশে প্রতি বছর ৪ শতাংশ মানুষ (সংখ্যায় ৫০-৬০ লাখ) শুধু চিকিৎসা-ব্যয়ের কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে শহর-গ্রামের বৈষম্য এখনো প্রকট, যেখানে উন্নত হাসপাতাল শহরকেন্দ্রিক এবং গ্রামে সীমিত চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে। যদিও কমিউনিটি ক্লিনিক একটি ইতিবাচক উদ্যোগ, তবুও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা ও উন্নত পরীক্ষানিরীক্ষা গ্রামীণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।
স্বাস্থ্যকর্মী সংকট ও অন্যান্য সমস্যা
WHO-এর মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য কমপক্ষে ৪৪.৫ জন দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী (ডাক্তার, নার্স ও ধাত্রী) থাকা জরুরি, কিন্তু বাংলাদেশে এই সংখ্যা মাত্র ১০-১২ জন। এই ঘাটতির মধ্যে নার্সিং সেক্টর সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে, যেখানে একজন ডাক্তার গড়ে ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার মানুষের চিকিৎসা দিচ্ছেন, সেখানে একজন নার্সকে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে হচ্ছে।
দুর্নীতি ও সুশাসনের সংকট স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় সমস্যা, যেখানে ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ওষুধ সরবরাহে দুর্নীতি এবং কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি সেবার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এছাড়া, বাংলাদেশ এখন একটি 'epidemiological transition'-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং ক্যানসার দ্রুত বাড়ছে, বর্তমানে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি অসংক্রামক রোগজনিত, কিন্তু স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো এই পরিবর্তনের সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাওয়াতে পারেনি।
স্বাস্থ্যসেবা: অধিকার নাকি পণ্য?
স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার, কিন্তু বাংলাদেশে এই অধিকার এখনো সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত নয়। একদিকে সাফল্যের গল্প, অন্যদিকে বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস—এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে দেশের স্বাস্থ্য খাত। সরকারি সেবার মান কম বিধায় মানুষ বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোতে যেতে বাধ্য হচ্ছে, এবং বিদেশে চিকিৎসার প্রবণতা বাড়ছে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা ক্রমশ সামর্থ্যনির্ভর হয়ে উঠছে, যার অর্থ আছে সে উন্নত চিকিৎসা পায়, আর যার অর্থ নেই সে দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘ লাইনে, সীমিত সেবা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি মানবাধিকারের প্রশ্ন, এবং একটি সভ্য, মানবিক রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব তার নাগরিকদের জন্য ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে: স্বাস্থ্যসেবা কি অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, নাকি এটি সামর্থ্যের ভিত্তিতে বিভক্ত থাকবে? একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে এই বৈষম্যের দেওয়াল ভাঙতেই হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমানভাবে চিকিৎসার সুযোগ পায় এবং স্বাস্থ্যসেবা পণ্য হিসেবে নয়, বরং মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত হয়।



