ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অধ্যায়ের সূচনা হলো। যে আইএএস অফিসারের হাত ধরে গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ‘ভোটার ছাঁটাই’ অভিযান সম্পন্ন হয়েছিল, সেই মনোজ কুমার আগরওয়ালকেই রাজ্যের নতুন মুখ্যসচিব পদে নিয়োগ দিল সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকার।
নতুন নিয়োগের ঘোষণা
সোমবার (১১ মে) নবান্ন থেকে জারি করা এক নির্দেশে এই নিয়োগের কথা জানানো হয়েছে। বিদায়ী তৃণমূল সরকারের আমলের আমলাতন্ত্রকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া হিসেবেই একে দেখছে রাজনৈতিক মহল।
১৯৯০ ব্যাচের এই অভিজ্ঞ আমলা ঠিক সেই সময়েই রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক পদে বসলেন, যখন বাংলায় প্রথমবার ক্ষমতায় এসে প্রশাসনিক স্তরে ব্যাপক পরিবর্তনের পথে হাঁটছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
ভোটার তালিকা সংশোধন বিতর্ক
মনোজ আগরওয়াল গত কয়েক মাস যাবৎ রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার নেতৃত্বেই ২০২৬-এর নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় রাজ্যজুড়ে প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
তৃণমূল কংগ্রেস শুরু থেকেই এই বিশাল সংখ্যক ভোটার বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সরব হয়েছিল এবং আগরওয়ালকে সরাসরি ‘বিজেপির ঘনিষ্ঠ’ হিসেবে অভিযুক্ত করেছিল। এমনকি নন্দীগ্রামে নির্বাচনী সফরের সময় এক বিজেপি কর্মীর সাথে তাকে দেখা যাওয়ায় তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগও জানিয়েছিল ঘাসফুল শিবির।
বিপরীতে বিজেপি এই পদক্ষেপকে ‘ভুয়া ভোটার মুক্ত’ করার একটি শুদ্ধিকরণ অভিযান হিসেবেই বর্ণনা করে এসেছিল। সেই নির্বাচনের পরেই মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক থেকে সরাসরি মুখ্যসচিবের চেয়ারে তার উত্তরণ রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কর্মজীবনের বিতর্কিত অধ্যায়
তবে মনোজ আগরওয়ালের কর্মজীবন কেবল রাজনৈতিক বিতর্কেই সীমাবদ্ধ নয়। তার ক্যারিয়ারের ডায়েরিতে যেমন সাফল্যের রেকর্ড আছে, তেমনই রয়েছে সিবিআই তদন্তের পুরনো ইতিহাস। ২০০৯-১০ সালে আয়বহির্ভূত সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছিল কেন্দ্রীয় সংস্থাটি। যদিও পরবর্তীকালে সেই মামলার রেশ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যায়।
অন্যদিকে, আমলা মহলে তার পরিচিতি এমন এক অফিসারের যিনি প্রভাবশালী রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করতে চান না। ২০১৮ সালে খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের সচিব থাকাকালীন রেশন দুর্নীতির অভিযোগে এফআইআর করার সাহস দেখিয়েছিলেন তিনি, যার জেরে তাকে তৎকালীন মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের রোষানলে পড়ে দপ্তর ছাড়তে হয়েছিল।
অবসরের আগে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
আগামী জুলাই মাসে আগরওয়ালের চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার কথা। ঠিক তার কয়েক সপ্তাহ আগে রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক পদের চাবিকাঠি তার হাতে তুলে দেওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
পর্যবেক্ষকদের মতে, যে অফিসার নির্বাচন পরিচালনায় শাসক দলের রোষানলে পড়েছিলেন, তাকেই প্রশাসনের শিখরে বসিয়ে বিজেপি সরকার একাধারে যেমন তার কাজের পুরস্কার দিল, তেমনই পূর্বতন প্রশাসনের বিরুদ্ধে এক কড়া বার্তাও পৌঁছে দিল।
সূত্র: দ্য প্রিন্ট।



