চীন সফরে ট্রাম্প: বাণিজ্য যুদ্ধ থেকে সমঝোতার পথে
চীন সফরে ট্রাম্প: বাণিজ্য যুদ্ধ থেকে সমঝোতার পথে

এক বছর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, বড় আকারে বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে নতজানু করতে পারবেন। তবে আদালতের রায়ের কারণে তিনি তাঁর সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এর মধ্যে চীন সফরে যাচ্ছেন ট্রাম্প। রাজনীতিবিষয়ক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখন চীনকে নতজানু করার লক্ষ্য থেকে সরে এসেছেন ট্রাম্প। তাঁর সে লক্ষ্য সীমিত হয়ে সয়াবিন, গরুর মাংস এবং বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ বিক্রির মতো কয়েকটি চুক্তির মধ্যে এসে ঠেকেছে। একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধের সমাধানে চীনের সহায়তাও চাইছেন তিনি।

বেইজিংয়ে শীর্ষ বৈঠক

১৪ ও ১৫ মে সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা। গত অক্টোবরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ স্থগিত করার পর এটি দুই নেতার প্রথম সাক্ষাৎ। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলেজান্দ্রো রেয়েস বলেন, ‘এক অর্থে এখন ট্রাম্পেরই চীনকে বেশি প্রয়োজন, চীনের ট্রাম্পকে নয়।’

ট্রাম্প ও সি চিন পিংয়ের মধ্যে আসন্ন বৈঠক হবে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে। দুই নেতা গ্রেট হল অব দ্য পিপলে শীর্ষ বৈঠকে অংশ নেবেন। ইউনেসকো ঘোষিত ঐতিহ্যবাহী স্থান টেম্পল অব হেভেন ঘুরে দেখবেন এবং রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় যোগ দেবেন। তাঁরা একসঙ্গে চা পান করবেন ও মধ্যাহ্নভোজ সারবেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ট্রাম্পের সাফল্যের প্রয়োজন

রেয়েস আরও বলেন, ‘ট্রাম্পের এখন পররাষ্ট্রনীতি পর্যায়ে একটি সাফল্য দরকার। এমন একটি সাফল্য, যা দেখিয়ে দেবে যে তিনি শুধু বৈশ্বিক রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করতেই ব্যস্ত নন; তিনি বিশ্বে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চান।’

ট্রাম্প ও সি চিন পিংয়ের মধ্যে সর্বশেষ বৈঠকটি হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বিমানঘাঁটিতে। সংক্ষিপ্ত ওই বৈঠকে ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা তিন অঙ্কের শুল্ক স্থগিত করেছিলেন। আর সি চিন পিং বৈশ্বিক বাজারে বিরল খনিজ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি থেকে সরে এসেছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এর পর থেকে চীন নীরবে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল আরও জোরালো করেছে। আর ট্রাম্প তাঁর শুল্কনীতির বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতের রায় মোকাবিলা করা এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সামলাতে ব্যস্ত ছিলেন। এ যুদ্ধের কারণে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তাঁর জনপ্রিয়তাও কমে গেছে।

বাণিজ্যচুক্তি ও তাইওয়ান প্রসঙ্গ

তবে পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থনৈতিক পর্যায়ে এই বৈঠক থেকে বড় কোনো সাফল্য আসার সম্ভাবনা কম। মূলত কয়েকটি বাণিজ্যচুক্তি এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু রূপরেখা তৈরির বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে দুই নেতা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্যযুদ্ধে চলমান বিরতির মেয়াদ আরও বাড়াতে রাজি হবেন কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।

ট্রাম্পের সঙ্গে এই সফরে টেসলার প্রধান ইলন মাস্ক এবং অ্যাপলের প্রধান টিম কুকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন নির্বাহী কর্মকর্তা থাকবেন। ২০১৭ সালে তিনি যখন বেইজিং সফর করেছিলেন, তার তুলনায় এবারের ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল আকারে ছোট।

গতকাল সোমবার ট্রাম্প বলেছেন, বাণিজ্য আলোচনা ছাড়াও তিনি বৈঠকে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি এবং হংকংয়ে কারাবন্দী থাকা গণমাধ্যম উদ্যোক্তা জিমি লাইয়ের বিষয়টিও তুলে ধরবেন। পাশাপাশি, চীনে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে বন্দী থাকা দুই মার্কিন নাগরিকের পরিবারও তাঁদের মুক্তির জন্য ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তাঁকে (সি) অনেক সম্মান করি এবং আশা করি তিনিও আমাকে সম্মান করেন।’

একের পর এক যুদ্ধ

ট্রাম্প ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে চীনের ওপর শুল্ক আরোপের বিষয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। ট্রাম্প সেখানে বলেছিলেন, তাঁর আরোপিত শুল্ক চীনকে বুঝিয়ে দেবে, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে শোষণ করার দিন শেষ।’

এই শুল্কের জবাবে বেইজিং তাদের বিরল খনিজ রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে। এতে পশ্চিমা বিশ্বের একটি বড় দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে যায়। কারণ, এসব খনিজের ওপর পশ্চিমা বিশ্বের বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে অস্ত্র তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলোর অনেক বেশি নির্ভরশীলতা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত এ চাপই ট্রাম্প ও সি চিন পিংয়ের মধ্যে একটি সমঝোতার পথ তৈরি করে।

এর পর থেকে ট্রাম্প একের পর এক নতুন সংকটে জড়িয়ে পড়েন। এর মধ্যে ভেনেজুয়েলার নেতাকে তুলে নেওয়া, ন্যাটোর সদস্য গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত করার হুমকি এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো, যা মধ্যপ্রাচ্যকে বিশৃঙ্খলায় ফেলে দেয় এবং বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটও তৈরি করে।

গত মাসে রয়টার্স/ইপসোসের করা জরিপ অনুযায়ী, ৬০ শতাংশের বেশি মার্কিন নাগরিক ইরান যুদ্ধকে সমর্থন করেন না।

এখন ট্রাম্প চাইছেন, চীন যেন ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে আসতে রাজি করায়, যেন চলমান সংঘাতের অবসান ঘটে। ইরানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। দেশটি ইরানের রপ্তানীকৃত তেলের অন্যতম বড় ক্রেতাও।

তাইওয়ান নিয়ে উদ্বেগ

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মার্কিন উপ–জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাট পটিংগার গত সপ্তাহে তাইপেতে অনুষ্ঠিত এক ফোরামে বলেছেন, যদিও চীন হয়তো চাইছে, এমন কিছু হোক, যা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাকে কিছুটা দুর্বল করে দেবে। তবে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে তারাও পুরোপুরি মুক্ত নয়।

কোনো চুক্তি হলে তার বিনিময়ে কিছু সুবিধা পেতে চাইবে চীন। আর সি চিন পিংয়ের অগ্রাধিকারের জায়গাটি হলো তাইওয়ান। স্বায়ত্তশাসিত এ দ্বীপ অঞ্চলকে চীন নিজের অংশ বলে দাবি করে থাকে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়, তাহলে তাইওয়ানের ওপর চাপ বাড়ানোর বিষয়ে চীন আরও সাহসী হয়ে উঠতে পারে। এমনকি শক্তি প্রয়োগের চিন্তাও করতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্র যদি শুধু তাদের বক্তব্য বা অবস্থান সামান্য বদলায়, তাহলে তাইওয়ান নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়বে। এতে এশিয়ার অন্যান্য দেশও চিন্তিত হয়ে পড়তে পারে। কারণ, তারা যুক্তরাষ্ট্রকেই নিরাপত্তার বড় ভরসা হিসেবে দেখে।

সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতি-পরামর্শ বোর্ডের সদস্য উ জিনবো বলেন, ট্রাম্পের উচিত স্পষ্ট করে বলা, তিনি তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করবেন না বা কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনৈতিক এজেন্ডাকে উৎসাহিত করে—এমন কোনো পদক্ষেপ নেবেন না।

লোকদেখানো যুদ্ধবিরতি

চীন চায়, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন যেন আর কোনো পাল্টা বাণিজ্য পদক্ষেপ না নেয়—বিশেষ করে প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মতো ব্যবস্থা না নেয়। একই সঙ্গে তারা চায় চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি এবং উন্নত মেমোরি চিপের ওপর আগে থেকে থাকা নিষেধাজ্ঞাও শিথিল করা হোক। আলোচনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এমনটাই বলেছেন।

গত অক্টোবর থেকে বেইজিং নিজেদের অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বাড়াচ্ছে। তারা এমন আইন চালু করেছে, যাতে বিদেশি কোম্পানিগুলো যদি চীন থেকে সরিয়ে সরবরাহশৃঙ্খল অন্য দেশে নেয়, তবে তাদের শাস্তির মুখে পড়তে হয়। পাশাপাশি বিরল খনিজ রপ্তানির লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থাও আরও কঠোর করেছে চীন।

জরিপ অনুযায়ী, এখন ৫৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা ও সম্পর্ক বজায় রাখা উচিত। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৪০ শতাংশ। এটি গত অক্টোবর মাসে শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সে প্রকাশ হয়েছে।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, যদি দুই দেশের সম্পর্ক শুধু স্থিতিশীল থাকে এবং চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের অস্থায়ী বিরতি কিছুটা সময়ের জন্যও বাড়ানো যায়, সেটাকেই ট্রাম্প নিজের জন্য একটি ‘সাফল্য’ হিসেবে দেখাতে পারেন।