ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে মাঠে নামছেন তাঁর দুই প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। দেশটির দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ তাঁদের দল একীভূত করে চলতি বছরের শেষে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে একসঙ্গে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
নতুন জোট 'টুগেদার'
গতকাল রোববার এক যৌথ বিবৃতিতে কট্টরপন্থী বেনেট ও মধ্যপন্থী লাপিদ এ ঘোষণা দেন। বেনেটের রাজনৈতিক দল 'বেনেট ২০২৬' এবং লাপিদের 'ইয়েশ আতিদ' মিলে গঠিত নতুন জোটের নাম রাখা হয়েছে 'টুগেদার'। এর নেতৃত্বে থাকবেন বেনেট নিজেই।
এক যৌথ টেলিভিশন ভাষণে বেনেট বলেন, 'আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, আজ রাতে আমার বন্ধু ইয়ার লাপিদের সঙ্গে মিলে আমরা দেশের জন্য সবচেয়ে দেশপ্রেমিক ও জায়নবাদী পদক্ষেপটি নিয়েছি।'
লাপিদ বলেন, 'বেনেট ডানপন্থী, কিন্তু সৎ মানুষ। আমাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা আছে। এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য বিরোধী শিবিরকে ঐক্যবদ্ধ করা, অভ্যন্তরীণ বিভাজন দূর করা এবং আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হয়ে ইসরায়েলকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।'
আদর্শিক পার্থক্য ও ঐক্য
দুই দলের আদর্শিক মিল খুব একটা নেই। নেতানিয়াহুর বিরোধিতাই মূলত তাদের একসুতায় গেঁথেছে। বিচ্ছিন্ন বিরোধী দলগুলোকে এক ছাদের নিচে আনাই এই জোটের প্রধান লক্ষ্য।
বেনেট ঘোষণা দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার দিনটিতে কী কী ব্যর্থতা ছিল, তা খতিয়ে দেখতে একটি জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করবেন। নেতানিয়াহু সরকার এখন পর্যন্ত এ ধরনের ব্যর্থতার দাবি নাকচ করে আসছে।
পূর্ববর্তী জোট
আবারও একজোট বেনেট ও লাপিদ এর আগেও হাত মিলিয়েছিলেন। ২০২১ সালের নির্বাচনে তাঁরা একজোট হয়ে নেতানিয়াহুর টানা ১২ বছরের শাসনের ইতি টানেন। তবে সেই জোট সরকার টেকে মাত্র ১৮ মাস।
এর আগে ২০১৩ সালেও বেনেট ও লাপিদ জোট করে নেতানিয়াহুর সরকারে ঢুকে পড়েছিলেন। তাঁদের কৌশলী চালের কারণে নেতানিয়াহু তাঁর পুরোনো বন্ধু কট্টর অর্থোডক্স দলগুলোকে বাদ দিয়েই সরকার গড়তে বাধ্য হয়েছিলেন।
নেতানিয়াহুর ভাবমূর্তি পতন
২০২২ সালের নভেম্বরে ক্ষমতায় ফিরে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর ডানপন্থী সরকার গঠন করেন নেতানিয়াহু। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ওই হামলার জবাবে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল যে ভয়াবহ হামলা শুরু করে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিবেশী দেশগুলোতে যেসব হামলা চালায়, তাতে নিরাপত্তারক্ষক হিসেবে নেতানিয়াহুর ভাবমূর্তি পুরোপুরি ধসে পড়েছে।
জনমত জরিপ
২৬ মার্চ ২০২৬ এর পর থেকে হওয়া একের পর এক জনমত জরিপ আভাস দিচ্ছে, ২০২৬ সালের অক্টোবরের শেষ নাগাদ যে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে, তাতে নেতানিয়াহু হারতে চলেছেন।
৫৪ বছর বয়সী নাফতালি বেনেট একসময় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কমান্ডো ছিলেন। পরে প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা হিসেবে কোটিপতি বনে যান। সাম্প্রতিক নির্বাচনী জনমত জরিপগুলোতে তিনি নেতানিয়াহুর চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে আছেন।
২৩ এপ্রিল ইসরায়েলের এন১২ নিউজের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে বেনেটের দল ২১টি আসনে জয়ী হতে পারে। বিপরীতে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি পেতে পারে ২৫টি আসন।
ওই একই জরিপে দেখা গেছে, ইয়ার লাপিদের দল মাত্র ৭টি আসন পেতে পারে, যা তাদের বর্তমানে থাকা ২৪টি আসনের চেয়ে অনেক কম। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের আগের জরিপগুলোর সঙ্গেও এই ফলাফলের মিল রয়েছে। জরিপে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বেনেটকেই সবচেয়ে এগিয়ে রাখা হয়েছে।
লাপিদের অবস্থান
সাবেক টিভি সংবাদ উপস্থাপক ৬২ বছর বয়সী ইয়ার লাপিদ দাবি করেন, তিনি ইসরায়েলের ধর্মনিরপেক্ষ মধ্যবিত্তশ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন। বর্তমানে করের বোঝা এবং সেনাবাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য নিয়ে এই শ্রেণিটি সরকারের ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ।



