যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজ থাকার প্রায় এক সপ্তাহ পর জানা যায়, জামিল লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি— দুইজনই প্রাণ হারিয়েছেন। লিমনের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে শনিবার (২৫ এপ্রিল) বৃষ্টির মৃত্যুর বিষয়টিও তার পরিবারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়। এ ঘটনায় লিমনের রুমমেট হিশাম সালেহ আবুঘারবিয়েহকে (২৬) স্থানীয় পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
হিশামের অন্ধকার অতীত
হিশামের বিষয়ে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। দীর্ঘদিন ধরেই সহিংস আচরণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ২৬ বছর বয়সী এই তরুণের অতীত ইতিহাস এখন স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার মেধাবী শিক্ষার্থী লিমনের মৃত্যুতে যখন পুরো কমিউনিটি গভীর শোকে নিমজ্জিত, তখন সন্দেহভাজন হিশামের অন্ধকার অতীত ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
সহিংসতার পুরনো অভিযোগ
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজউইকের প্রতিবেদনে জানায়, হিশাম মার্কিন নাগরিক। তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনা করলেও হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন না। আদালত ও স্থানীয় শেরিফ অফিসের রেকর্ড বিশ্লেষণ করে তার বিরুদ্ধে একাধিক সহিংসতার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
হিলসবোরো কাউন্টি আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে ও সেপ্টেম্বর মাসে হিশামের বিরুদ্ধে শারীরিক আঘাত করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেই সঙ্গে একটি জনশূন্য বাড়িতে চুরির অভিযোগও ছিল তার নামে। যদিও তখন সেগুলোকে কিছুটা লঘু অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল, কিন্তু তার পরিবারের সদস্যরা তার আচরণ নিয়ে আগে থেকেই শঙ্কিত ছিলেন।
পরিবারের এক সদস্য হিশামের এমন সহিংস আচরণের কারণে তার বিরুদ্ধে দুটি পারিবারিক সুরক্ষা নিষেধাজ্ঞা বা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স ইনজাংশনের আবেদন করেছিলেন। আদালত তার মধ্যে একটি আবেদন মঞ্জুরও করেছিল। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের মতো অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
লাশ উদ্ধারের নাটকীয় ঘটনা
লিমনের লাশ উদ্ধারের দিনটি ছিল স্থানীয় পুলিশের জন্য অত্যন্ত নাটকীয় ও উত্তেজনার। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) লিমনের দেহের অবশিষ্টাংশ ট্যাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড সেতু থেকে উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা পরেই পুলিশ হিশামের পরিবারের বাড়ি থেকে পারিবারিক সহিংসতার একটি ফোন পায়। পুলিশ দ্রুত সেখানে উপস্থিত হলে হিশাম ঘরের ভেতর নিজেকে অবরুদ্ধ করে ফেলেন এবং পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানান। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াট টিমকে তলব করতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এ উত্তেজনার পর অবশেষে সোয়াট টিমের চাপে হিশাম আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন।
হিলসবোরো কাউন্টির চিফ ডেপুটি জোসেফ মাউরার জানিয়েছেন, লিমনের মৃত্যুর ঘটনায় হিশামকে একাধিক অভিযোগে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মৃত্যুর সংবাদ না দেওয়া, অবৈধভাবে মৃতদেহ সরানো, আলামত নষ্ট করা, নিজেকে মিথ্যা ও অন্যায়ভাবে আটকে রাখা এবং পারিবারিক সহিংসতা ও শারীরিক আঘাত করা। জামিল লিমনের মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
বৃষ্টির মৃত্যু রহস্য
এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা এস বৃষ্টির নিখোঁজ থাকার বিষয়টি এখনো এক বড় রহস্য হয়ে আছে। যদিও তার ভাইয়ের দাবি বৃষ্টিও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে তিনি এ তথ্য জানান।



