ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানি আবারও এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির জায়গা ফিরে পেয়েছেন। গত শুক্রবার শেয়ারবাজারে আদানি গ্রুপের মালিকানাধীন প্রধান ছয়টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে যায়। তাতেই শীর্ষ ধনীদের তালিকায় এ বড় পরিবর্তন এসেছে।
সম্পদে নাটকীয় উত্থান
মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র এক দিনের ব্যবধানে শুক্রবার গৌতম আদানির সম্পদ প্রায় ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার বেড়েছে। এই নাটকীয় উত্থানের পর বর্তমানে আদানির মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৯২০ কোটি মার্কিন ডলারে। এর মাধ্যমে তিনি ভারতের আরেক শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানি ও জাপানের সফট ব্যাংক গোষ্ঠীর প্রধান মাসায়োশি সনকে পেছনে ফেলে এশিয়ার ধনীদের তালিকায় শীর্ষ স্থান দখল করলেন। বর্তমানে মুকেশ আম্বানির সম্পদের পরিমাণ ৮ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। আর জাপানের মাসায়োশি সনের সম্পদের পরিমাণ ৮ হাজার ৭০০ কোটি ডলার।
আদানি গ্রুপের কোম্পানিগুলোর অবস্থা
আদানি গ্রুপের কোম্পানিগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ‘আদানি পাওয়ার’। প্রতিষ্ঠানটির একক বাজার মূলধন এখন ৪ হাজার ৭২০ কোটি ডলার। কোম্পানিটি বাংলাদেশে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যে ১৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অবস্থিত।
শেয়ারদরে বড় লাফ
শুক্রবার আদানির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শেয়ারের দামে সবচেয়ে বড় লাফ দিয়েছে তাদের পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘আদানি গ্রিন এনার্জি’। কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়েছে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। এ ছাড়া তাদের বিদ্যুৎ সঞ্চালন, মূল প্রতিষ্ঠান, বন্দর পরিচালনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সব মিলিয়ে আদানির ছয়টি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বাজারমূল্য এখন প্রায় ১৯ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
বিতর্ক ও প্রত্যাবর্তনের নেপথ্য
ফোর্বস জানায়, গত কয়েক বছর ধরে একের পর এক বড় ধাক্কা এসেছে আদানি গোষ্ঠীর ওপর। ২০২৩ সালে মার্কিন শর্ট-সেলার প্রতিষ্ঠান হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজারে কারসাজি ও হিসাব জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ আনে। সে সময় বিষয়টিকে করপোরেট ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বড় ধোঁকাবাজি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল তারা। তবে ভারতের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থায় (সেবি) গত বছর এই অভিযোগগুলো ‘প্রমাণিত হয়নি’ বলে খারিজ করে দেওয়ার পর আদানি গ্রুপ স্বস্তি পায়।
তবে বিতর্ক এখানেই শেষ হয়নি। ২০২৪ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিওজে) গৌতম আদানি ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের ফৌজদারি অভিযোগনামা গঠন করে। অভিযোগ ছিল, ভারতে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহের বড় চুক্তি পেতে আদানি ও তাঁর সহযোগীরা ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের প্রায় ২৫ কোটি ডলার ঘুষ দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। একই সঙ্গে এই তথ্য গোপন করে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন তাঁরা।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে লবিং
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে লবিং সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে ফোর্বসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে হওয়া এই মামলা ও অভিযোগ বাতিলের জন্য চলতি বছরের শুরুর দিকে ব্যাপক লবিং শুরু করেন গৌতম আদানি। যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট ও আইনজীবী নিয়োগ করে তিনি এই আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি এই সংকট মোকাবিলায় ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে কীভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যায়, সে বিষয়ে ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও পরামর্শ নিয়েছেন আদানি।
ইতিমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আদানির প্রতিনিধিদের বেশ কয়েকটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
শেয়ারবাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও পুনরুদ্ধার
সব মিলিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক নানা টানাপোড়েনের মধ্যেও শেয়ারবাজারে আদানি গ্রুপের কোম্পানিগুলোর মূল্যবৃদ্ধি আদানির ব্যক্তিগত সম্পদে বড় ধরনের উত্থান ঘটিয়েছে, যা তাঁকে আবারও এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির আসনে বসিয়েছে।



