পরিবার ছাড়া এটা চতুর্থ ঈদ, দূর পরবাসে বসে যাঁরা নিজের আপনজন ছেড়ে ঈদ উদ্যাপন করেন, তাঁরা জানেন যে এটা কতটা বেদনার! তবে ঈদ সব সময়ই আসে ভালোবাসা ও আনন্দের বার্তা নিয়ে, এবারের ঈদে বাড়তি আনন্দ যোগ হয়েছে আমাদের চীনা বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপন করতে পেরে।
ঈদের প্রস্তুতি ও আয়োজন
ঈদের দুই দিন আগে থেকেই প্রচণ্ড বৃষ্টি, থামাথামির নাম নেই এই ছোট্ট শহর ডালিয়ানে। এর ভেতর অফিস থেকে এক দিনের ছুটি নিয়ে ঈদের আয়োজন করতে নেমে পড়লাম।
ঈদ শুরু হলো ঈদের আগের দিন বাসায় ফিরে বউয়ের হাতে মেহেদি দেওয়ার মাধ্যমে। খুব সুন্দর আলপনায় সে এঁকে ফেলল ভালোবাসা আর আনন্দের মিশেল তার দুহাতে।
এরপর আগামীকাল কী রান্না হবে, সেটা নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মতো দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিলাম, সেটা হলো খাবারের স্বাদ যাচাই করা! পাশাপাশি কিছু লঘু দায়িত্বও ছিল, বাজার করা, রসুন ছিলে দেওয়া ও ঘর গোছানো!
যাহোক, সেই কঠিন দায়িত্ব শেষে আমরা ঈদের আগের রাতে দুজনই দেখে ফেললাম তানিম নূরের ‘বনলতা এক্সপ্রেস’।
ঈদের দিনের শুরু
একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে ঘুমাতে গেলাম আর সকালে ঘুম থেকে উঠেই সেমাই খেয়ে তাড়াহুড়ো করে রওনা দিলাম মসজিদে নামাজের উদ্দেশ্যে। এখানে পুরুষ ও মহিলা একসঙ্গে নামাজ পড়েন।
আমরা গিয়ে পৌঁছুলাম সকাল সাড়ে আটটায়। গিয়ে দেখি প্রচণ্ড ভিড়ে হরেক দেশের হরেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মসজিদে ঢুকতে দেবে না, কারণ প্রথম স্লট নাকি আগেই ভর্তি হয়ে গেছে, দ্বিতীয় জামাত ১০টায়, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
কী আর করা! ছাতা হাতে শুরু হলো অপেক্ষা। বাইরে তখনো বৃষ্টির ধারা বয়ে চলছে। এর ভেতরে ছোট ছোট শিশুসহ মহিলারাও রয়েছেন। কিছুক্ষণ পরে মসজিদ কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল যে বাইরে দাঁড়ানো বাকি মহিলা ও শিশুদের প্রথম স্লটেই ঢুকতে দেবে, এরপর আমার স্ত্রীও ঢুকে পড়ল অন্যদের সঙ্গে, দাঁড়িয়ে রইলাম আমিসহ আরও অনেক মুসল্লি।
তবে ভাগ্য ভালো, পাশে পেয়ে গেলাম যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক রুহুল আমিন ভাইকে, যিনি বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী, তাঁর সঙ্গে গল্প করলাম ওখানে দাঁড়িয়েই। বাঙালি বলতে উনিই ছিলেন, উনি মূলত এখন এখানে পিএইচডি করতে এসেছেন।
অপেক্ষার পালা শেষ করে আমরা অবশেষে দ্বিতীয় স্লটে নামাজ পড়তে সক্ষম হলাম। ত্যাগ ও সহমর্মিতার বাণীর মাধ্যমে নামাজ শেষ করে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি, তখনো বৃষ্টি হচ্ছে।
তাই আর বাইরে বেশিক্ষণ থাকা গেল না, ট্যাক্সি ডেকে ফিরে গেলাম বাসায়।
পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ও আতিথেয়তা
বাসায় গিয়ে আম্মু, বোন, শ্বশুর–শাশুড়ি সবাইকে ঈদের বার্তা দিয়ে আমি কখন যে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি, তার ইয়ত্তা নেই। ঘুম ভাঙল আমার পাকিস্তানি বন্ধু বিলালের কল দেখে। তাকে আজ দুপুরে দাওয়াত দিয়েছি। এদিকে দেখি, আমার স্ত্রীও রান্নার কাজে ব্যস্ত।
তাই উঠে দুজন মিলে যত দ্রুত সম্ভব রান্না ও অন্যান্য কাজ শেষ করতে করতে বিলাল এসে উপস্থিত। এরপর একসঙ্গে চলল ঈদের প্রথম দুপুরের খাবার। খাবার শেষ করে বিলালের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করতে করতেই স্ত্রীর ফোন।
তাকে নিয়ে নিজের গাড়িতে করে বেরিয়ে পড়লাম সমুদ্রের কাছে। প্রকৃতি যেন আজ অপরূপ সৌন্দর্যে সেজেছে, একদিকে টিপ টিপ বৃষ্টি শেষে স্নিগ্ধ প্রকৃতির গান, অন্যদিকে ঈদের আনন্দ। সব মিলিয়ে স্বর্গ যেন নেমে এল কিছুক্ষণের জন্য ধরায়।
এরপর ঘোরাঘুরি দ্রুত শেষ করতে হলো, কারণ রাতেই আসবে দাওয়াতের অন্য চীনা বন্ধু দম্পতি অতিথি। তাদের জন্য প্রস্তুতি নিতে নিতেই তারা বলল যে যাত্রা শুরু করেছে, কিছুক্ষণের ভেতরই এসে পৌঁছাবে।
ততক্ষণে আমাদেরও প্রস্তুতি নেওয়া শেষ। কলবেলের শব্দে দরজা খুলে তাদের হাসিমুখ দেখে আমাদেরও ভালো লাগল, এদিকে রাতও হয়ে গিয়েছিল, তাই আর দেরি না করে ডিনার শুরু করলাম।
বাংলাদেশি খাবারের স্বাদ ও আড্ডা
আমরা বাঙালিরা যে অতিথিপরায়ণ, সে কথা আবার প্রমাণ করতেই আমার স্ত্রী চেষ্টা করেছিল হরেক রকম খাবার দিয়ে টেবিল সাজাতে, বাসমতি চালের ভাত, গরুর মাংস ভুনা, মুরগির রোস্ট, রুই মাছের পদ, চিংড়ির মালাইকারি, নকশি পিঠা, চিকেন কাটলেট, সংসা পিঠা (গরুর মাংসের কিমা দিয়ে তৈরি বিশেষ একধরনের পিঠা), সেমাই, ফল, পানীয় আরও কত কী!
চীনা বন্ধু মাইক ও টিকা ভীষণ তৃপ্তিসহকারে যখন খাওয়াদাওয়া শেষ করল, তখন আমাদেরও ভালো লাগছিল বাংলাদেশের খাবারের স্বাদের অভিজ্ঞতা তাদের দিতে পেরে।
এরপর চলল আড্ডা, কত কী গল্প! আড্ডায় বাংলাদেশের কক্সবাজার থেকে শুরু করে আরও উঠে এল কীভাবে গাড়ি চালিয়ে তিন দিনে বাংলাদেশে চলে যাওয়া যায়। তাঁরা বাংলা ভাষা বলারও আপ্রাণ চেষ্টা করল, যেটাতে সবাই যারপরনাই হাসিতে ফেটে পড়ছিলাম, কিন্তু সব শেষে প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত চলল আমাদের ঈদ আড্ডা।
এরপর তাদের বিদায় দিয়ে ফিরে এলাম আমাদের ঘরে। সারা দিনের ক্লান্তি কিন্তু পরিবার ছাড়া কষ্টের মধ্যেও এখানের বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার স্মৃতিটুকু সঙ্গে নিয়ে ঘুমাতে গেলাম।
স্বপ্নে পরের ঈদ
স্বপ্নে দেখলাম, পরের ঈদ করছি বাংলাদেশে আমার সব আত্মীয়র সঙ্গে। মা, বোন, স্ত্রী, বন্ধু, আত্মীয় সবাই আছে, এ রকম একটা ঈদের অপেক্ষায়...
*লেখক: সাজ্জাদুল ইসলাম, সাউথ এশিয়ান রিজিওনাল ম্যানেজার, টিঅ্যান্ডবি গ্রুপ, চায়না



