পেশায় প্লাস্টিক সার্জন ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা আদম হিশাম হামাউই বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে অনুষ্ঠিত তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে তিনি জয়ী হয়েছেন। আগামী নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের একটি আসনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নির্বাচনী পটভূমি
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন প্রতিনিধি পরিষদের বেশ কিছু আসনে ভোট হবে। আদম হামাউই নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে জয়ী হলেন। আসনটি ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
নিউ জার্সির যেসব এলাকা ডেমোক্র্যাট ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, সেসব এলাকার প্রাইমারিতে প্রগতিশীলেরা বিজয়ের ধারা অব্যাহত রেখেছেন। তবে অন্যদের তুলনায় হামাউইকে নিয়ে তুলনামূলক বেশি আলোচনা হচ্ছে। এর কারণও আছে। যদি তিনি নভেম্বরে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ী হন, তাহলে তিনি হবেন মার্কিন কংগ্রেসের একমাত্র সদস্য, যাঁর গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ নিজের চোখে দেখার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। নির্বাচনে হামাউইর সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী গ্রেগ মেল।
গাজায় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা
হামাউইর জন্ম মিসরে। গত এপ্রিলে আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ২০২৪ সালে গাজায় তাঁর চিকিৎসা মিশন শেষে ওয়াশিংটন ডিসিতে ফিরে যাওয়ার পরের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
হামাউই বলেন, ‘[আমি] একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আমাদের আইনপ্রণেতা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। আমি বলেছিলাম, ওখানে এটা ঘটছে। এটা বাস্তব। এটা ভুয়া খবর নয়। এটা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিষয় নয়। আমি নিজে এটা দেখেছি এবং নিজের চোখে যা দেখেছি, (সেখানে) সেটাই ঘটছে।’
আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পান বলে জানান হামাউই। তিনি বলেন, কয়েকজন আইনপ্রণেতা তাঁর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলেন। অন্যরা ব্যক্তিগতভাবে নিন্দা জানালেও প্রকাশ্যে কোনো পদক্ষেপ নেননি। আর কেউ কেউ হামাউইয়ের সঙ্গে কোনো বৈঠক করতেই রাজি হননি। তাঁরা নিজেদের দরজা তাঁর জন্য বন্ধ রাখেন।
নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রেরণা
হামাউই বলেন, ‘এটাই (আইনপ্রণেতা ও জনপ্রতিনিধিদের প্রতিক্রিয়া) আমাকে নির্বাচনে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। আমাদের আরও সাহসী (নির্বাচিত প্রতিনিধি) দরকার। এমন মানুষ আরও দরকার, যাঁরা সত্যিকার অর্থে যা ভুল, তা জানার পর তার বিরুদ্ধে কাজ করবেন।’
হামাউই আশা প্রকাশ করেন, একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি প্রতিনিধি পরিষদকে ইসরায়েলের গাজায় যুদ্ধ এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার বিষয়ে আরও সরাসরি ও কঠোর অবস্থান নিতে প্রভাবিত করতে পারবেন।
হামাউই বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে, এই সমস্যার সমাধান করতে আমার নিজেকেই ওয়াশিংটনে যেতে হবে।’
গাজায় চোখে দেখা হত্যাযজ্ঞ
গাজায় ফিলিস্তিনিদের জীবনে কংগ্রেসের ভূমিকা অনেক বেশি। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ইসরায়েলকে যে হাজার কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দেয়, তা অনুমোদনের দায়িত্ব কংগ্রেসের। এ ছাড়া অস্ত্র স্থানান্তর বন্ধ বা বাধা দেওয়ার জন্য আইন প্রণয়নের ক্ষমতাও তাদেরই হাতে।
কংগ্রেসের সদস্যরা নিয়মিত ইসরায়েল সফর করেন। কেউ কেউ অধিকৃত পশ্চিম তীরেও যান। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বর্তমান কংগ্রেসের কোনো সদস্য গাজা সফর করেছেন বলে জানা যায়নি।
২০২৩ সালের অক্টোবরে উইসকনসিনের প্রতিনিধি কংগ্রেস সদস্য মার্ক পোকান বলেন, ইসরায়েলের চলমান অবরোধের কারণে গত এক দশকে কোনো কংগ্রেস সদস্যকে গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ২০০৫ সালে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের গাজা থেকে প্রত্যাহারের পর ইসরায়েল ওই অবরোধ আরোপ করে।
সীমিত প্রবেশাধিকার
সীমান্ত এলাকায় খুব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ও পূর্বনির্ধারিত সফরগুলো বাদ দিলে, মার্কিন কংগ্রেসের কোনো বর্তমান সদস্য গাজা সফর করেছেন—এমন সর্বশেষ জানা ঘটনা ২০১৩ সালের। সেবার কিথ এলিসন গাজা সফর করেন।
এরপর ২০১৮ সালে পোকান তাঁর দুই সহকর্মী ড্যানিয়েল কিলডি এবং হেনরি ‘হ্যাঙ্ক’ জনসনের সঙ্গে মিলে ইসরায়েলকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে তাঁরা গাজায় প্রবেশের অনুমতি চান।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, দুই বছর আগেও তাঁরা একই ধরনের প্রবেশাধিকার চেয়েছিলেন। কিন্তু তখন তাদের সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।
এই তিনজন চিঠিতে উল্লেখ করেন, তাঁরা গাজায় জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) এবং যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) মাধ্যমে দেওয়া মার্কিন করদাতাদের অর্থে পরিচালিত মানবিক সহায়তা সঠিক ও কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা তদারকি করতে চেয়েছিলেন।
এরপর রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউএনআরডব্লিউএর জন্য বরাদ্দ মার্কিন তহবিল প্রত্যাহার করে নেন। ইউএসএআইডির কার্যক্রমও কার্যত বন্ধ করে দেন। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক সহায়তার পরিমাণ অনেক কমে গেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে বিধিনিষেধ আরও বেড়েছে। এখন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ তত্ত্বাবধান ছাড়া কোনো সাংবাদিক বা বাইরের পর্যবেক্ষককে গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না।
হামাউই বলেন, বাইরের লোকজনের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দিয়ে ইসরায়েল এমন একটি বর্ণনা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে, ‘এরা (গাজার ফিলিস্তিনিরা) খারাপ মানুষ। তাদের বোমা মেরে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা দরকার।’
যুদ্ধক্ষেত্রের চিকিৎসা অভিজ্ঞতা
সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে কাজ করা হামাউইয়ের জন্য নতুন কিছু নয়। তিনি বসনিয়া, সুদান, হাইতি, লেবানন ও সিরিয়ায় চিকিৎসা মিশনে অংশ নিয়েছেন।
তবে গাজায় ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের তেল আবিবকে সমর্থনের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতাকে বিশেষ বলে বর্ণনা করেছেন হামাউই।
গাজায় এই ডেমোক্র্যাট নেতা একের পর এক ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েলি হামলায় স্থায়ীভাবে অঙ্গহানি বা বিকলাঙ্গ হয়ে যেতে দেখেছেন।
হামাউই বলেন, ‘সেখানে গিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা নেওয়া—এমনকি এমন একটি শিশুর চিকিৎসা করা, বোমায় যার হাত উড়ে গেছে এবং যে তার পুরো পরিবার হারিয়েছে—এই সবকিছু আপনি আর মনে থেকে সরাতে পারবেন না। কারণ, আপনাকে তার অপারেশন করতে হয়, পরের দিন আবার তাকে দেখতে যেতে হয়। এরপর আপনি আরেকজন রোগীকে দেখেন। ধারাবাহিকভাবে এটি চলতেই থাকে।’
যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করাটাও অবিশ্বাস্য চাপের বলে মন্তব্য করেন এই চিকিৎসক।
যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে হামাউই বলেন, ‘অভিজ্ঞতাটি এমন যে আপনি এমনকি ঘুমাতেও পারবেন না। কারণ, একের পর এক বোমা হামলা চলতে থাকে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আপনার মাথার ওপর ২৪ ঘণ্টাই ড্রোন ঘুরতে থাকে। আর আপনি জানেন, যেকোনো মুহূর্তে কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। নিজের জীবনের ওপর আপনার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।’
হামাউই আরও উল্লেখ করেন, নিউ জার্সিতে ফিরে তিনি দেখেন, সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সেবা পাওয়ার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, অথচ ওয়াশিংটন যুদ্ধের জন্য অর্থ ব্যয় করে চলেছে।
সমর্থন ও প্রতিক্রিয়া
এরই মধ্যে কয়েকজন সিনেটর হামাউইর পক্ষে তাঁদের সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁদের একজন সিনেটর ট্যামি ডাকওয়ার্থ। ২০০৪ সালে ইরাকে একটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর ডাকওয়ার্থ গুরুতর আহত হয়েছিলেন। সে সময় হামাউই তাঁর জীবন বাঁচিয়েছিলেন।
প্রগতিশীল ধারার জনপ্রিয় নেতা সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও হামাউইর প্রতি সমর্থন দিয়েছেন।



