কিমের হুঁশিয়ারি: উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র বাড়বে ‘জ্যামিতিক হারে’
কিমের হুঁশিয়ারি: উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র বাড়বে ‘জ্যামিতিক হারে’

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন একটি নতুন অস্ত্রমানের পারমাণবিক উপাদান উৎপাদনকারী স্থাপনা পরিদর্শন করে দেশটির পারমাণবিক শক্তি 'জ্যামিতিক হারে' বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএ বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানিয়েছে।

পাঁচ বছরে সক্ষমতা দ্বিগুণ

কিম জং উনের দাবি, গত পাঁচ বছরে উত্তর কোরিয়া অস্ত্রমানের পারমাণবিক উপাদান উৎপাদনের সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, নতুন কারখানাটি দেশটির পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার অংশ

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্প্রসারণের এই পদক্ষেপ একটি পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরস্ত্রীকরণ আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কিম জং উনের সঙ্গে তিনটি শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও সেগুলো কোনো কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

নতুন পারমাণবিক স্থাপনার খবর এমন সময় সামনে এলো, যখন ওয়াশিংটন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা উত্তেজনা ও সংঘাত প্রশমনের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তেহরানকে অস্ত্র-উপযোগী পারমাণবিক উপাদান উৎপাদন থেকে বিরত রাখার কূটনৈতিক উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা

গত মার্চে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর কোরিয়ার কাছে সর্বোচ্চ ৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির মতো উপাদান থাকতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৫০টি ওয়ারহেড ইতোমধ্যে তৈরি করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ) মার্চ মাসে জানিয়েছিল, উত্তর কোরিয়ায় অন্তত দুটি সক্রিয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র রয়েছে— একটি ইয়ংবিয়ন এবং অন্যটি কাংসন এলাকায়। সংস্থাটি আরও জানায়, ইয়ংবিয়নে একটি নতুন ভবনের নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যার অবকাঠামো ও সক্ষমতা কাংসনের সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

নতুন স্থাপনার রহস্য

তবে বুধবার কিম জং উন যে স্থাপনাটি পরিদর্শন করেছেন, সেটি ওই নতুন ইয়ংবিয়ন কেন্দ্র কি না, নাকি আগে অজানা অন্য কোনো স্থাপনা— তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কেসিএনএও স্থাপনাটির অবস্থান প্রকাশ করেনি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে এটি অন্তত তৃতীয়বারের মতো, যখন উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কিম জং উনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পারমাণবিক উপাদান উৎপাদনকেন্দ্র পরিদর্শনের ছবি প্রকাশ করল। কেসিএনএ জানিয়েছে, নতুন কারখানায় আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রকাশিত ছবিতে কিমকে সারি সারি সেন্ট্রিফিউজের মাঝখানে হাঁটতে দেখা যায়।

বিশ্লেষকদের মতামত

কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং মিন মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, নতুন স্থাপনাটি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির আরও পরিণত ও সম্প্রসারিত রূপকে নির্দেশ করে। তার মতে, দেশটি এখন গবেষণা ও উন্নয়ন পর্যায় থেকে সরে গিয়ে 'গণউৎপাদন ও অস্ত্রায়ন'-এর দিকে এগোচ্ছে। হং মিন আরও বলেন, নিয়ন্ত্রণকক্ষ, প্রক্রিয়াকরণ পাইপলাইন এবং বিভিন্ন উৎপাদন মডিউলের ছবি প্রকাশের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া ইচ্ছাকৃতভাবেই একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর পারমাণবিক উৎপাদন অবকাঠামোর বার্তা দিতে চেয়েছে।

ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা

পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি উত্তর কোরিয়া গত কয়েক বছরে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক হুমকি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটি এমন আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) সফলভাবে পরীক্ষা করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম বলে ধারণা করা হয়।

কিমের বক্তব্য

বুধবার পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের প্রশংসা করে কিম জং উন বলেন, তারা পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার লক্ষ্য পূরণ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা এখন 'কল্পনারও অতীত'। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটির পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে উত্থানকে একটি কৌশলগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, ট্রাম্প প্রশাসন পূর্ববর্তী পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করার পরও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি থামানো সম্ভব হয়নি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চলছে, যখন উত্তর কোরিয়া প্রকাশ্যেই তার পারমাণবিক সক্ষমতা আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিচ্ছে। এদিকে ২০২৬ সালের 'নিউক্লিয়ার উইপন্স ব্যান মনিটর ২০২৬' প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার বৃদ্ধি আসলে একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের নয়টি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের সক্রিয় ও মোতায়েনযোগ্য পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ৭৪৫-এ পৌঁছেছে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, এসব অস্ত্রের সম্মিলিত বিস্ফোরণক্ষমতা হিরোশিমা পারমাণবিক বোমার ১ লাখ ৩৫ হাজারটিরও বেশি সমতুল্য। এছাড়া ২০২৫ সাল ছিল টানা নবম বছর, যখন বিশ্বে মোতায়েনযোগ্য পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার রয়েছে রাশিয়ার হাতে, যার সংখ্যা ৫ হাজার ৪০০-এর বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যার কাছে প্রায় ৫ হাজার ৩০০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।