সমুদ্র কখনো কখনো এতটাই শান্ত থাকে যে ক্যাপ্টেন হাসান খান (ছদ্মনাম) প্রায় ভুলেই যান, তাঁর জাহাজটি তিন মাস ধরে এক যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝখানে আটকে আছে। এই পাকিস্তানি নাবিক বলেন, 'এটা সত্যিই অদ্ভুত। বাইরে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হয়, কিন্তু ভেতরের মানুষগুলো শান্ত নেই।'
উপসাগরের এ অংশটিতে সবকিছু দেখতে স্বাভাবিক মনে হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর পর হাসান খান এবং আরও প্রায় ২০ হাজার নাবিক হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে আটকা পড়ে আছেন। যে হরমুজ প্রণালি একসময় বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত নৌপথগুলোর একটি ছিল এবং যেটি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হতো, সেটি এখন প্রায় অচল পড়ে আছে। কারণ, এখন প্রণালির ওপর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র উড়ছে এবং সমুদ্রের ঢেউয়ের নিচে মাইন পেতে রাখা হয়েছে।
এরপরও ক্যাপ্টেন হাসান খানের জাহাজের নাবিকেরা স্বাভাবিক কাজকর্মগুলো করে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে কখনো কখনো তীরে নামার বিরল অনুমতি পেলেও তাঁরা কেউ তীরে নামতে চান না। যাঁরা একসময় হাসিঠাট্টা ও প্রাণবন্ত কথাবার্তায় মেতে থাকতেন, তাঁদের মধ্যে এখন নীরবতা আর দুশ্চিন্তার ছায়া। মাঝেমধ্যে শুধু মোবাইল ফোনের শব্দে সে নীরবতা ভাঙে। সামান্য কোনো শব্দ শুনলেই সবাই চমকে ওঠেন, এমনকি ঘুমের মধ্যেও। হাসান খান বলেন, 'আমাদের মনের মধ্যে সব সময় একধরনের চাপ কাজ করে।' তিনি আরও বলেন, 'সবাই ভীষণ ক্লান্ত—শারীরিকভাবেও, মানসিকভাবেও।'
পারাপার ও সরবরাহ
ক্ষেপণাস্ত্র ও সমুদ্র-মাইনের ঝুঁকি না থাকলেও হরমুজ প্রণালির উল্টো পাশে আটকে থাকা প্রায় ১ হাজার ৬০০টি জাহাজ সেখান থেকে বের হতে পারছে না। নৌযান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা (আইএমও) এমন হিসাব দিয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই তেহরান এই সংকীর্ণ জলপথটি বন্ধ করে দেয়। উপসাগর থেকে বের হওয়ার এটিই একমাত্র পথ। ইরান ঘোষণা দিয়েছে, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই পথ দিয়ে যেতে পারবে না।
আরেক জাহাজের ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, 'মনে হচ্ছে আমরা যেন একটি পুকুরে আটকা পড়ে আছি। বের হওয়ার মাত্র একটি পথ আছে, আর সেটি হলো হরমুজ।' শফিকুল ইসলাম বাংলাদেশের মালিকানাধীন জাহাজ 'বাংলার জয়যাত্রা'র ক্যাপ্টেন। তাঁর জাহাজে প্রায় ৩৭ হাজার টন সার আছে। এই সার দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে যাওয়ার কথা। গত কয়েক মাসে তিনি দুবার ওই এলাকা ছাড়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দুবারই ব্যর্থ হয়েছেন।
গত ৮ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। এরপর শফিকুল ইসলাম জানতে পারেন, ইরানের বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) একটি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি দিয়েছে। তখন তিনি আরও চারটি জাহাজের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁদের সতর্ক করে বলা হয়, সামনে এগোনো যাবে না।
৯ দিন পর শফিকুল ইসলাম আবার চেষ্টা করেন। কারণ, ইরান বলেছিল, যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে প্রণালিটি সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য 'সম্পূর্ণ উন্মুক্ত' থাকবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বহাল রাখায় ইরান দ্রুত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। ততক্ষণে শফিকুল ইসলামের জাহাজ হরমুজ প্রণালি থেকে মাত্র ৩০ নটিক্যাল মাইল দূরত্বে পৌঁছে গিয়েছিল। রেডিওতে একের পর এক হামলার সতর্কবার্তা ভেসে আসতে থাকায় তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি জাহাজ ঘুরিয়ে নিতে বাধ্য হন।
নিরাপত্তার কারণে অনেক জাহাজ উপসাগরের বিভিন্ন বন্দরে চলে গেছে অথবা উপকূলের কাছাকাছি নোঙর করে আছে। কিন্তু এখন খাদ্য ও পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা ক্রমেই বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। বন্দরে প্রবেশ না করেও এসব সরবরাহ পাওয়া এখনো সম্ভব। কারণ, উপসাগরীয় অঞ্চল—বিশেষ করে দুবাই, আবুধাবি ও কুয়েত সিটির আশপাশের জাহাজে সরবরাহ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এখন সরবরাহ কখন পৌঁছাবে, তা আর নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
'বাংলার জয়যাত্রা'র প্রধান প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান বলেন, প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মধ্যে পানির দামই সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। রাশেদুল বলেন, 'দুই দিন আগে আমরা জাহাজের জন্য প্রায় ১৮০ টন পানি কিনেছি। আগে এর জন্য খরচ হতো ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ডলার। এখন একই পরিমাণ পানির জন্য আমাদের ১১ হাজার ডলার গুনতে হয়েছে।'
কোরিয়ার এক নাবিক বলেন, 'এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে খাবার ও পানি সরবরাহকারীদের কেউ কেউ অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে।' ওই কোরীয় নাবিক তাঁর নাম প্রকাশে রাজি হননি। তিনি অন্য একটি জাহাজে আছেন। আটকে থাকা জাহাজগুলোর জন্য এখন আরও বেশি পানি প্রয়োজন হবে। কারণ, গ্রীষ্মকাল ঘনিয়ে আসছে। মে মাসেই তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সামনে তা ৪৫ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারে।
ক্যাপ্টেন হাসান খানের জাহাজে এখনো খাবার ও পানি আছে। তবে তিনি বলেন, এখনো তিনি গরুর মাংস ও মুরগি পাচ্ছেন, তবে শাকসবজি ও ডাল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
মৃত্যু ও কূটনীতি
তবু শফিকুল ইসলাম নিজেকে কিছুটা ভাগ্যবান মনে করেন। সংঘাতের দ্বিতীয় দিনেই তাঁর জাহাজটি জেবেল আলী বন্দর থেকে মাত্র ২০০ মিটার (৬৫৬ ফুট) দূরে ছিল—যা মাঝারি আকারের একটি ট্যাংকারের দৈর্ঘ্যের কাছাকাছি। সে বন্দরটি তখন ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। এর পর থেকে শফিকুল ইসলাম এবং তাঁর ৩০ জন নাবিক কতগুলো হামলার ঘটনা দেখেছেন তার হিসাব নেই। ক্যাপ্টেন বলেন, 'কখনো কখনো একটি জাহাজের ওপর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যায়, আবার কখনো পাশের জাহাজে ধ্বংসাবশেষ পড়ে।'
প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান বলেন, 'রাতভর হামলা চললে আমরা কেউই ঘুমাতে পারতাম না। আমরা নিজের চোখে ভয়াবহ ধ্বংস ও বিভীষিকা দেখেছি।' তাঁদের ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণও আছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও সমুদ্র-মাইনের ঝুঁকি না থাকলেও হরমুজ প্রণালির উল্টো পাশে আটকে থাকা প্রায় ১ হাজার ৬০০টি জাহাজ সেখান থেকে বের হতে পারছে না। নৌযান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা (আইএমও) এমন হিসাব দিয়েছে। আইএমও বলেছে, তারা ৩৯টি হামলার ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে পেরেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ১১ জন নাবিক নিহত হয়েছেন এবং একজন নিখোঁজ আছেন।
যুদ্ধবিরতির পর উত্তেজনা কিছুটা কমলেও প্রণালিতে চলমান সামরিক কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে পরিস্থিতি নাজুক অবস্থায় আছে। কিছু নাবিক এখনো ড্রোন ও যুদ্ধবিমান দেখতে পাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ নিয়মিত নৌযান ও সাবমেরিনের উপস্থিতিও লক্ষ করছেন। পাকিস্তানি বাবুর্চি সাজিদ মাসুদ (ছদ্মনাম) বলেন, জাহাজগুলোতে এখনো উজ্জ্বল আলো জ্বালানো হয় এবং লাউডস্পিকারে ঘোষণা শোনা যায়। তাঁর মতে, কেউ যেন প্রণালি দিয়ে অতিক্রম করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে ইরান এই ব্যবস্থা করেছে। মাসুদের নিরাপত্তার জন্য তাঁর ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।
আটকে থাকা নাবিকদের কী হবে
আটকে থাকা জাহাজের পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। তারা কর্মী বাবদ খরচ কমানোর কথা ভাবছে। অনেক নাবিকের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে এবং বড় পরিসরে নাবিক পরিবর্তন অনেক আগেই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এত লোক একসঙ্গে জাহাজে পাঠানো বা বদলি করা কঠিন হয়ে পড়বে। পাকিস্তানি নাবিক কামিল (ছদ্মনাম) বলেন, 'এই সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, এই পেশা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। অনেক নাবিক ভবিষ্যতে এই পেশা নিয়ে ভিন্নভাবে ভাবতে পারেন।' কামিল আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতের সংঘাতে আন্তর্জাতিক জলপথগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
বাবুর্চি সাজিদ মাসুদও সমুদ্রজীবন নিয়ে আবার ভাবছেন। তাঁর চুক্তির মেয়াদ এখন মাত্র এক মাস বাকি। তবে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সাজিদ শুধু দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন। দুবাই থেকে পরিবারের জন্য উপহার নেওয়ার কথা ভাবছেন—মেয়েদের জন্য বার্বি পুতুল, আর ছেলের জন্য একটি খেলনা বিমান। সাজিদ মাসুদ বলেন, 'আমি ভেবেছিলাম শিগগিরই বাড়ি ফিরব, কিন্তু আমরা এখনো আটকে আছি। প্রতিদিন আমার পরিবার জিজ্ঞেস করে—আমি কখন ফিরব, কিন্তু আমার কাছে তাদের জন্য কোনো উত্তর নেই।'
নৌযান চলাচলবিষয়ক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭৫০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছে। ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর নেভাল অ্যানালাইসেসের গবেষক জনাথন শ্রোডেন বলেন, এসব জাহাজের মালিকেরা মূলত ইরানের সঙ্গে সরাসরি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক যোগাযোগের ওপর নির্ভর করেছেন। এর বেশির ভাগ জাহাজ এসেছে চীন, ভারত ও পাকিস্তান থেকে। শ্রোডেন আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রতি জাহাজকে বেশ কয়েক লাখ ডলার পর্যন্ত মাশুল দিতে হয়েছে।
এখন 'বাংলার জয়যাত্রা'র জন্য কূটনৈতিক পথকেই সবচেয়ে বড় আশা হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাহাজটির মুক্তির জন্য বাংলাদেশ সরকার তার মালিক বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের সঙ্গে কাজ করছে। তবে সেটাও সহজ হয়নি। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুল মালেক বলেছেন, শুরুতে বাংলাদেশ ইরানের দাবি করা টোল দিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্র ওই ধরনের অর্থ পরিশোধ করলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার হুমকি দেয়। ফলে পরিকল্পনাটি বাতিল করা হয়। মাহমুদুল বলেন, 'এখন আমরা একধরনের উভয়সংকটে আছি।'



