১৯৪৮ সালে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনিকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদের মাধ্যমে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই ঘটনা ‘নাকবা’ বা ‘মহাবিপর্যয়’ নামে পরিচিত। প্রতি বছর এই সময়ে ফিলিস্তিনের মানুষ ও অধিকারকর্মীদের মনে প্রশ্ন জাগে: ফিলিস্তিনের ইতিহাসকে পুরোপুরি স্বীকার না করে যুক্তরাষ্ট্র কি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ন্যায়সংগত নীতিমালা তৈরি করতে পারবে?
নাকবার ৭৮তম স্মরণ দিবস
গত শুক্রবার (১৫ মে) ছিল নাকবার ৭৮তম স্মরণ দিবস। ১৯৪৮ সালে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনিকে জোর করে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। তাদের পশ্চিম তীর, গাজা এবং আশপাশের আরব দেশগুলোর শরণার্থীশিবিরে পাঠানো হয়। প্রায় ৪০০ শহর ও গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়ে। বালাদ আল-শেখ, সাসা, দেইর ইয়াসিন, সলিহা ও লিদ্দাসহ বিভিন্ন জায়গায় হত্যার ঘটনা ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও সমালোচনা
যুক্তরাষ্ট্র সরকার নাকবাকে স্বীকৃতি দেয় না। অথচ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল প্রভাব রয়েছে এবং তারা ইসরায়েল সরকারকে শক্ত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনের বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। গাজা পুনর্গঠন কাজ তদারকির জন্য তারা বিতর্কিত ‘শান্তি পর্ষদ’ গঠন করেছে। একই সময়ে ইসরায়েলের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিও তারা নমনীয় অবস্থান বজায় রেখেছে।
ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে নাকবাকে স্বীকার না করে যুক্তরাষ্ট্র দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে কুইনচি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো খালেদ এলগিংডি বলেন, উত্তর খুব সহজ। আর সেটি হলো, ‘না’। খালেদ এলগিংডি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আপনি যদি শুধু এক পক্ষের মানবতা ও কষ্টকে স্বীকার করেন, তাহলে আপনাকে এমন ঐতিহাসিক বাস্তবতাগুলোকে উপেক্ষা করতে হবে, যা আজও বিদ্যমান।’
মার্কিন জনমনে পরিবর্তন
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন জনমনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। জরিপে দেখা গেছে, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি বাড়ছে এবং ইসরায়েল সরকারের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবও বাড়ছে। বিশেষ করে গাজায় যুদ্ধের পর ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধে অন্তত ৭৫ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। খালেদ বলেন, এই সংঘাত চালিয়ে যেতে যুক্তরাষ্ট্রও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কংগ্রেসে রাশিদা তালিবের প্রস্তাব
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য রাশিদা তালিব গত বৃহস্পতিবার একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। ওই প্রস্তাবে ‘চলমান নাকবা এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অধিকারকে’ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ নিয়ে তিনি টানা পঞ্চমবারের মতো প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। সর্বশেষ প্রস্তাবের পক্ষে ১২ জন সমর্থক আছেন। ২০২২ সালে প্রথমবার প্রস্তাব উত্থাপনের সময় সমর্থক ছিলেন ৬ জন। রাশিদা তালিব ভিডিও কনফারেন্সে বলেন, নাকবার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা জরুরি। কারণ, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা এখনো চলছে।
রাশিদা বলেন, কংগ্রেসের অনেক সহকর্মী এমনভাবে আচরণ করেন, যেন ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা শুধু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সময় থেকেই শুরু হয়েছে। রাশিদার মতে, ফিলিস্তিনের ইতিহাস ১৯৪৮ সাল থেকে চলা নাকবা এবং ‘জাতিগত উচ্ছেদ-সংক্রান্ত অভিযান’-এর ইতিহাস।
নাকবার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৪৮ সালের নাকবার সময় প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনিকে জোর করে তাঁদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের পশ্চিম তীর, গাজা এবং আশপাশের আরব দেশগুলোর শরণার্থীশিবিরে পাঠানো হয়। প্রায় ৪০০ শহর ও গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়ে। বালাদ আল-শেখ, সাসা, দেইর ইয়াসিন, সলিহা ও লিদ্দাসহ বিভিন্ন জায়গায় হত্যার ঘটনা ঘটে।
জাতিসংঘ ২০২৩ সালে প্রথমবার নাকবা স্মরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল। সেটি ছিল নাকবার ৭৫তম বার্ষিকী। এর আগে নাকবাকে স্বীকৃতি দিতে জাতিসংঘে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ ৩০টি দেশ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেয়। জাতিসংঘ আয়োজিত নাকবা স্মরণ অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেয়নি। তারা অভিযোগ করেছিল, জাতিসংঘে ‘ইসরায়েলবিরোধী পক্ষপাত’ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বিবর্তন
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সরকার নাকবাকে স্বীকৃতি দেওয়া থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখলেও সব সময় পরিস্থিতি এমন ছিল না। কুইনচি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো খালেদ এলগিংডি বলেন, ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান ইহুদি মিলিশিয়া ও গোপন সংগঠনগুলোর চালানো সন্ত্রাস ও সহিংসতার সমালোচনা করেছিলেন। যদিও তাঁর সরকারই প্রথম ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানের প্রশাসন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৯৪ নম্বর প্রস্তাবকে সমর্থন করেছিল। এই প্রস্তাবে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের নিজ ঘরে ‘ফিরে যাওয়ার অধিকার’-এরও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ নিবন্ধিত ফিলিস্তিনি শরণার্থী আছে।
ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের পরিচালক জশ রুয়েবনার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার যে ফিলিস্তিনিদের ওপর হওয়া সহিংসতা সম্পর্কে জানত, সে বিষয়ে অনেক প্রমাণ রয়েছে। যদিও তখন কর্মকর্তাদের কাছে নাকবা শব্দটি ব্যবহার করার ভাষা বা এটিকে ‘জাতিগত নিধন’ বা ‘গণহত্যা’ বলার মতো শব্দভান্ডার ছিল না। রুয়েবনার বলেন, ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কী করেছিল, তা জেরুজালেম, হাইফা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য জায়গায় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক দপ্তরের নথি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়। তাঁরা ফিলিস্তিনিদের সম্পদ লুট, ধ্বংস, মানুষকে ঘরবাড়ি থেকে জোর করে বের করে দেওয়া, তাঁদের ওপর চালানো নির্যাতন এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ফেরত নিতে ইসরায়েলের অস্বীকৃতি—সবই বুঝতে পেরেছিলেন।
তবে এর পরের বছরগুলোতে আর ফিলিস্তিনিদের ফেরত পাঠানোর প্রচেষ্টা খুব একটা নিয়মিত ছিল না। ১৯৬০-এর দশকে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সময়ে আবার এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। তখন তিনি বড় আকারের স্নায়ুযুদ্ধ কৌশলের অংশ হিসেবে প্রথমবার ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র দেন। পরে ১৯৯০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের শাসনামলে অসলো চুক্তিসংক্রান্ত আলোচনার সময়ও ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার বিষয়টি আবার সামনে আসে। আরও পরে ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বিরলভাবে নাকবা শব্দটি উল্লেখ করেন।
তবে খালেদ এলডিংগি বলেন, ১৯৬০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন-এর সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি ইসরায়েলকে জোরালোভাবে সমর্থন করতে শুরু করে, ততই নাকবাকে স্বীকার করার বিষয়টি থেকে দূরে সরে যায়। খালেদ বলেন, ‘এ বিষয়ে ঐতিহাসিক তথ্য একেবারেই স্পষ্ট।’ খালেদ আরও বলেন, ‘আমার গবেষণায় সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এসব বিষয় ভুলে যেতে এক প্রজন্মেরও কম সময় লেগেছে।’
নাকবা স্বীকৃতির বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা
রাশিদা তালিবের প্রস্তাবটির সমর্থকেরা বলছেন, এর গুরুত্ব শুধু প্রতীকী নয়, বাস্তব রাজনৈতিক অর্থও আছে। পিটার রুয়েবনার বলেন, নীতিনির্ধারকেরা যদি নাকবাকে বিবেচনায় না নেন এবং আজকের দিনে যতটা সম্ভব তার সমাধান করার চেষ্টা না করেন, তাহলে বলব তাঁরা শুধু একটি অন্যায় ব্যবস্থাকেই চলতে দিচ্ছেন। ইউসেফ মুনায়ের বলেন, নাকবাকে স্বীকৃতি দেওয়া শুধু অতীতকে স্বীকার করার বিষয় নয়, বরং বর্তমান সময়ের পরিস্থিতিকেও বোঝার ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করে। মুনায়ের বলেন, ‘ফিলিস্তিনে নাকবাকে স্বীকার করতে আমাদের ৮০ বছর পার করে দেওয়াটা ঠিক হচ্ছে না। আর গাজায় যে জাতিগত নিধন চলছে, সেটিকে স্বীকার করতে আরও ৮০ বছর অপেক্ষা করা উচিত হবে না।’
কংগ্রেস সদস্যদের মনোভাবেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কংগ্রেসে আগে ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টিকে প্রায় ‘অবধারিত’ হিসেবে ধরা হলেও এখন দেশটিতে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার প্রস্তাবও আগের চেয়ে বেশি সমর্থন পাচ্ছে। গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ সদস্যবিশিষ্ট সিনেটের ৪০ জন ডেমোক্র্যাট সদস্য ইসরায়েলে সামরিক বুলডোজার বিক্রি বন্ধ করার পক্ষে ভোট দেন। এসব যন্ত্র ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখলের চলমান প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়। যদিও কংগ্রেসে এই বিল পাস হয়নি, তবু অধিকারকর্মীরা এই ভোটকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেছেন। চলতি মাসের শুরুতে কংগ্রেসের ৩০ জন সদস্য ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতিমালার ‘আনুষ্ঠানিক অস্পষ্টতা’ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। বিষয়টি দশক ধরে প্রায় নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে বিবেচিত ছিল। আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো ইউসেফ মুনায়ের মনে করেন, রাশিদা তালিবের প্রস্তাবটি হয়তো আজকালের মধ্যেই পাস হবে না। তবে একদিন না একদিন এটি পাস হবেই।



