২০১২ সালের শীত মৌসুমে বেইজিং এবং উত্তর চীনের বিস্তীর্ণ সমতলভূমিতে নভেম্বরের শুরুতেই নেমে এসেছিল তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। হাঁড়কাঁপুনে সেই আবহাওয়াই যেন জানান দিচ্ছিল, পুরো মাসটা কেমন যাবে।
গ্রেট হল অব দ্য পিপলে উত্তেজনা
১৫ নভেম্বর, আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম তিয়েনআনমেন স্কয়ারের পশ্চিম পাশে অবস্থিত গ্রেট হল অব দ্য পিপলের বাইরে, বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা সাংবাদিকদের ভিড়ে। কনকনে ঠান্ডা সত্ত্বেও চারপাশে ছিল এক ধরনের উত্তেজনা—চীনের রাজনীতির নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা আমরা প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছিলাম।
কোনোমতে নিরাপত্তা তল্লাশি পেরিয়ে ভেতরে ঢুকেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। বাইরে শূন্য ডিগ্রির নিচের তাপমাত্রা থেকে হলের উষ্ণতায় এসে স্বস্তি মিলল। সৌভাগ্যক্রমে মঞ্চের কাছাকাছি একটি আসনও পেয়েছিলাম। সেখান থেকেই প্রত্যক্ষ করি—চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শি জিনপিংয়ের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ।
শি জিনপিংয়ের দায়িত্ব গ্রহণ
সেদিনই হু জিনতাওয়ের উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেন শি জিনপিং; যিনি পরে মাও সেতুংয়ের পর প্রথম চীনা নেতা হিসেবে দুই মেয়াদের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকবেন। তাঁর ক্ষমতায় উত্থানের আনুষ্ঠানিক সূচনার সাক্ষী ছিলাম আমি—পার্টির ১৮তম কংগ্রেস কাভার করতে যাওয়া নির্বাচিত বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের একজন হিসেবে।
নভেম্বরের সেই মাঝামাঝি দিনের কথা এখনো মনে আছে। শি জিনপিং টানা ৯০ মিনিট ম্যান্দারিন ভাষায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। আমার কাছে তা ছিল সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য। চীনের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারাও তাঁর বক্তব্যের ইংরেজি অনুবাদ হাতে তুলে দেন বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর।
গ্রেট ওয়াল ভ্রমণের সিদ্ধান্ত
এক সপ্তাহ পর, দেশে ফেরার সময় ঘনিয়ে এলে মনজুড়ে নেমে আসে এক ধরনের বিষণ্নতা। এখনো তো গ্রেট ওয়াল দেখা হয়নি। হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কে জানতে চাইলে তারা শুধু ‘খারাপ খবর’ই দিল—আবহাওয়া দ্রুত খারাপ হচ্ছে, তুষারে ঢেকে গেছে যাওয়ার পথগুলো।
তারও আগে, ৩ থেকে ৫ নভেম্বরের মধ্যে, বেইজিংয়ে বয়ে যায় ঐতিহাসিক এক তুষারঝড়। শহরের বহু দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছিল বিপজ্জনক। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, ১৯ নভেম্বর গ্রেট ওয়ালের একটি অংশে তুষারের মধ্যে আটকা পড়ে দুজন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া নয়, সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অনুশোচনা। এত দূর, চীন দেশে গিয়ে বিশ্বের অন্যতম বিস্ময় না দেখে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারিনি।
মুতিয়ানইউ গ্রেট ওয়ালে যাত্রা
ঢাকায় ফেরার আগের দিন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জনপ্রিয় বাদালিং অংশের সড়ক বন্ধ ঘোষণা করে। শেষ পর্যন্ত অনেক চেষ্টা করে মুতিয়ানইউ অংশে যাওয়ার ব্যবস্থা করি। সেটি আমার বেইজিংয়ের হোটেল থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে।
বাস থেকে নামার পর দেখি, আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হলেও তাপমাত্রা তখনো হিমাঙ্কের নিচে। হালকা গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। চারপাশ যেন এক শীতের রূপকথার রাজ্য—অনিন্দ্য সুন্দর, আবার বিপজ্জনকও। উঁচু পথে উঠতে গিয়ে বারবার পিছলে যাচ্ছিলাম, সঙ্গে ছিল কনকনে হিমেল বাতাস। উঁচুতে ওঠার জন্য আমি আরও পাঁচজন পর্যটকের সঙ্গে কেবল কারে চড়ি। ওপরে কেবল কার থেকে নেমে হেঁটে আরও উপরে উঠতে শুরু করি, অত্যন্ত সতর্ক পায়ে। গভীর তুষার সরিয়ে ফেলা হলেও খাড়া পাথরের সিঁড়িতে জমে থাকা কালো বরফ এড়িয়ে চলতে হচ্ছিল। সদ্য পড়া তুষারের আস্তরণ প্রাচীন দেয়ালটিকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছিল।
মুতিয়ানইউ গ্রেট ওয়ালের ইতিহাস
মুতিয়ানইউ মিং রাজবংশের আমলে বানানো গ্রেট ওয়ালের সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত অংশগুলোর একটি। যদিও এর মূল নির্মাণ হয়েছিল নর্দার্ন চি রাজবংশের আমলে (৫৫০–৫৭৭), পরে মিং যুগে (১৩৬৮–১৬৪৪) জেনারেল শু দা মূল ভিত্তির ওপর এটি পুনর্নির্মাণ করেন।
৫ হাজার ৪০০ মিটারেরও বেশি বিস্তৃত এই অংশটি পাহাড়ঘেরা ভূপ্রকৃতির ওপর অসংখ্য প্রহরী টাওয়ার ও অনন্য প্রতিরক্ষা স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত। দেয়ালগুলো মূলত পাথরের স্ল্যাব দিয়ে নির্মিত এবং তাতে রয়েছে খাঁজকাটা প্রতিরক্ষা প্রাচীর।
১৪ নম্বর ওয়াচটাওয়ারে নিস্তব্ধতা
মুতিয়ানইউ গ্রেট ওয়ালের ১৪ নম্বর ওয়াচটাওয়ারে দাঁড়িয়ে, খিলান জানালার ভেতর দিয়ে বরফে ঢাকা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ভিন্ন এক নিস্তব্ধতা উপভোগ করছিলাম। মাত্র কয়েক দিন আগে পত্যক্ষ করা রাজনৈতিক গর্জনের সঙ্গে এর মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। টাওয়ারের খিলান জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল, দেয়ালটি কীভাবে আঁকাবাঁকা পথে পশ্চিমের ২০ নম্বর টাওয়ারের দিকে এগিয়ে গেছে।
মুতিয়ানইউ অংশে দেয়ালের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি দাঁড়াই হেনকেল মেমোরিয়াল স্টোনের সামনে। সেখানে লেখা কথাগুলো মনে গেঁথে নেওয়ার চেষ্টা করি: ‘একসময় যা ছিল শত্রুর আক্রমণ ঠেকানোর জন্য বানানো, আজ তা বিশ্বের মানুষের মিলনস্থল। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গ্রেট ওয়াল বন্ধুত্বের প্রতীক হয়ে থাকুক।’
এই ফলকটি ১৯৮৮–১৯৮৯ সালে গ্রেট ওয়ালের এই অংশ পুনরুদ্ধারের স্মারক। জার্মান প্রতিষ্ঠান হেনকেল এই কাজে অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছিল। জার্মান ও ইংরেজি ভাষায় খোদাই করা লেখাটি দেয়ালটির সামরিক প্রতিরক্ষা থেকে সাংস্কৃতিক নিদর্শনে রূপান্তরের কথাই তুলে ধরে। বরফঢাকা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, সামরিক দুর্গ থেকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে রূপান্তরিত হওয়া এই দেয়ালের যাত্রা সত্যিই গভীর অর্থবহ।
পরিবর্তনশীল চীনের সামনের সারির সাক্ষী
২০১২ সালে বেইজিংয়ে সিপিসির ১৮তম জাতীয় কংগ্রেস কাভার করতে গিয়ে আমার সফরজুড়ে দুটি বিষয় ছিল স্থায়ী—শি জিনপিংয়ের ঐতিহাসিক উত্থান এবং অবিরাম নভেম্বরের শৈত্যপ্রবাহ। গ্রেট হলের নিস্তব্ধ আসন থেকে শুরু করে মিং রাজবংশের মহাপ্রতিরক্ষার সেই পিচ্ছিল, হিমেল প্রাচীর—২০১২ যেন আমাকে একটি পরিবর্তনশীল চীনের একেবারে সামনের সারির সাক্ষী হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল।



