ইরান চুক্তিতে ক্ষুব্ধ ইসরাইলিরা, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ
ইরান চুক্তিতে ক্ষুব্ধ ইসরাইলিরা, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তিকে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও একাকীত্বের অনুভূতি গ্রাস করেছে ইসরাইলের সাধারণ জনগণকে। এই চুক্তিকে ইসরাইলের জন্য একটি বড় ধরনের বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন দেশটির নাগরিকেরা। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে অনেকেই ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

তেল আবিব থেকে মাত্র ১২ মাইল দূরে অবস্থিত রেহোভোত শহরটিকে ইসরাইলের জনমতের একটি প্রতিচ্ছবি বা ‘মধ্যবর্তী ইসরাইল’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানকার একটি রেস্তোরাঁয় বসে ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন ৫৫ বছর বয়সী প্রকৌশলী আভি পেরেজ। তিনি সরাসরি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। একই টেবিলে বসা ৩৫ বছর বয়সি শাহাম নোভিক মেন্যু কার্ড দেখতে দেখতে বলেন, বিষয়টি অদ্ভুত। একদিন আমরা আমাদের সন্তানদের নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে অবরুদ্ধ ছিলাম, আর পরের দিনই সবকিছু স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। অথচ কোনো সমস্যারই আসলে সমাধান হয়নি।

ইসরাইলিদের মূল উদ্বেগ হলো, এই চুক্তির ফলে ইরান আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে লেবাননের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই চুক্তি সীমান্ত এলাকায় হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলি বাহিনীর সামরিক সক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। রাজনৈতিক কৌশলবিদ ও আন্তর্জাতিক নির্বাচনী প্রচার ব্যবস্থাপক উদি তেন্নে এ প্রসঙ্গে বলেন, ইসরাইলিরা মনে করে লেবাননের যুদ্ধটি একটি ন্যায্য যুদ্ধ। এখানকার প্রতিটি মানুষ বোঝে যে ইরান এবং হিজবুল্লাহ আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। লেবানন সীমান্তের কাছাকাছি উত্তরের শহর মেতুল্লার এক রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী ড্যানিয়েল ডর্ফম্যান বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে সবাই সন্তুষ্ট ছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তি ইসরাইলের জন্য মোটেও ভালো কিছু নয়। এটি একটি মস্ত বড় ভুল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অনেকেই এই পরিস্থিতিকে ইসরাইলের যুদ্ধকালীন লক্ষ্য পূরণের একটি চরম ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। কারণ ইরান সরকারের পতন ঘটানো, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা নির্মূল করার যে লক্ষ্য ইসরাইল নির্ধারণ করেছিল, তার একটিও অর্জিত হয়নি। আরও বড় ধাক্কা এসেছে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে। যে যুদ্ধ ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শুরু করেছিল, তার শেষপ্রান্তে এসে ইসরাইলকে সম্পূর্ণ প্রান্তিক করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি গত সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলকে একটি ছোট শক্তি হিসেবেও অভিহিত করেছেন।

হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ পাওয়ার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের কাছ থেকে তীব্র সমালোচনা ও তিরস্কার শুনতে হয়েছে, বিশেষ করে লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযানের ফলে সৃষ্ট ব্যাপক বেসামরিক হতাহতের ঘটনায়। উল্লেখ্য, লেবাননে ইসরাইলের এই অভিযানে এ পর্যন্ত ৩,৯০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ইসরাইলের দৈনিক সংবাদপত্র ‘ইয়েদিওথ আহরোনথ’-এর কলামিস্ট নাদাভ ইয়াল লিখেছেন, ইসরাইলের শাসনব্যবস্থার একটি বড় অংশে এখন যে ধরনের আঘাত ও শোকের পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাদের ক্ষতস্থানে যেন লবণ ছিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এমন এক সংকটকালীন সময়ে দুর্নীতির মামলায় বিচারের মুখোমুখি ৭৬ বছর বয়সি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখন ভোটারদের আশ্বস্ত করার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। ইসরাইল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জনমত বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তামার হারম্যান বলেন, নেতানিয়াহু তার যুদ্ধকালীন লক্ষ্যগুলো অতি-স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে এক ধরনের অহংকার প্রদর্শন করেছিলেন। কিন্তু যখন আপনি সেই লক্ষ্যগুলো অর্জনে ব্যর্থ হবেন, তখন মানুষ আপনাকে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অক্ষম হিসেবেই বিবেচনা করবে।

চলতি বছরের অক্টোবর মাসে ইসরাইলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন দেশের জন্য একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট হতে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের আকস্মিক হামলায় ১,২০০ ইসরাইলি নিহত এবং প্রায় ২৫০ জন অপহৃত হওয়ার ঘটনার পর থেকেই নেতানিয়াহুর ওপর জনগণের আস্থা গভীরভাবে ধাক্কা খেয়েছিল। এরপর গাজায় ইসরাইলের দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী অভিযানে ৭৩,০০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যু আন্তর্জাতিক মহলে ইসরাইলকে একঘরে করে ফেলেছে।

গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ২৩ লাখ জনসংখ্যার ওপর এখনো হামাসের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে। অন্যদিকে, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযানও কোনো চূড়ান্ত ফলাফল এনে দিতে পারেনি। এত কিছুর পরও নেতানিয়াহুর একটি শক্ত সমর্থক গোষ্ঠী রয়ে গেছে। গত সপ্তাহের এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৩ শতাংশ ভোটার এখনো মনে করেন যে ইরানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটই সবচেয়ে সেরা বিকল্প। রেহোভোতের প্রকৌশলী আভি পেরেজও মনে করেন, মানুষ হিসেবে নেতানিয়াহু ভুল করতেই পারেন, তবে তিনি জানেন কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। ট্রাম্প শুধু তার ব্যবসার কথা ভাবেন, কিন্তু নেতানিয়াহু দেশের হয়ে কথা বলেন।

তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভাজন নিয়েও গভীর ক্ষোভ রয়েছে। রেহোভোতের ৩৪ বছর বয়সি এক চিকিৎসক লি নোভিক বলেন, নেতানিয়াহু বছরের পর বছর ধরে আমাদের বিভক্ত করার চেষ্টা করে আসছেন এবং তিনি তাতে সফল হয়েছেন। এই ডামাডোলের মধ্যে আবাসন সংকট বা মুদ্রাস্ফীতির মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। বর্তমান সরকার কেবল নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং বিভেদমূলক আইন পাস করতেই এই যুদ্ধকে ব্যবহার করছে।

যদিও রাজনৈতিক দলগুলো দেশের তীব্র মেরুকরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, অধ্যাপক হারম্যান অবশ্য মনে করেন ইসরাইলের সিংহভাগ ইহুদি ভোটারের মধ্যে মৌলিক কিছু বিষয়ে এখনো গভীর ঐক্য রয়েছে। তারা একটি উদার অর্থনৈতিক মডেলের পাশাপাশি শক্তিশালী কল্যাণ রাষ্ট্র ব্যবস্থা, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের ধারণাকে অবাস্তব বলে মনে করার ক্ষেত্রে একমত।

তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সত্যটি উঠে এসেছে রেহোভোতের বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সি ডালিয়া পেরেজের কথায়। তিনি বলেন, গত সপ্তাহের ঘটনাগুলো আমাকে শিখিয়েছে যে শান্তি আসলে কোনোদিন আসবে না। আমি যুদ্ধের অবসান চেয়েছিলাম, কিন্তু এখন বুঝতে পারছি আমাদের আজীবন তলোয়ারের ওপর ভর করেই বেঁচে থাকতে হবে। আমরা এখন ভালো করেই বুঝে গেছি যে আমাদের কোনো প্রকৃত বন্ধু নেই এবং আমরা কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে পারি না।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।