মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রভাব
চার দশকের বেশি সময় ধরে চলা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার ফলে ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নীতি দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাকলে তেল রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং নতুন বিনিয়োগের সুবাদে আগামী এক দশকের মধ্যেই ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
২২ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ৬০ দিনের জন্য ইরানের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ঘোষণা দেয়। এর ফলে মার্কিন কোম্পানিগুলো সরাসরি ইরানি তেল কিনতে পারবে, ডলারে মূল্য পরিশোধ করতে পারবে এবং আগে কালো তালিকাভুক্ত ট্যাংকার থেকেও তেল সংগ্রহের সুযোগ পাবে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম এত বড় পরিসরে ইরানি তেলের ওপর বিধিনিষেধ কার্যত শিথিল হলো।
নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের তেল নিষেধাজ্ঞা শুরু হয় ১৯৮০ সালে। পরে ২০১০-এর দশকে আরও কঠোর 'সেকেন্ডারি স্যাংশন' আরোপ করা হয়, যাতে অন্য দেশগুলোকেও ইরানি তেল কেনা থেকে বিরত রাখা হয়। ২০১৫ সালে পারমাণবিক চুক্তির পর কিছু নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হলেও ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর পর সেগুলো আবার কার্যকর হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সিদ্ধান্ত আগের সব ছাড়ের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত। এর মাধ্যমে ইরানের তেল রপ্তানির বড় বাধাগুলো সাময়িকভাবে দূর হয়েছে এবং দেশটির জ্বালানি খাত নতুন করে গতি পেতে শুরু করেছে।
তেল রপ্তানি বর্তমান অবস্থা
জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে প্রায় স্থবির অবস্থায় থাকা ইরানের তেল রপ্তানি বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। তবে যুদ্ধের আগে যে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল রপ্তানি হতো, সেই পর্যায়ে ফিরতে এখনও সময় লাগবে।
বিশ্ববাজারেও এই ঘোষণার বড় কোনো প্রভাব পড়েনি। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় অপরিবর্তিত থাকায় বিশ্লেষকদের ধারণা, বাজার আগেই ইরানি তেলের সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা ধরে নিয়েছিল।
নতুন ক্রেতার সন্ধান
তবে রপ্তানি আরও বাড়াতে হলে ইরানকে নতুন ক্রেতা খুঁজতে হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির অধিকাংশ তেল কিনেছে চীনের ছোট স্বাধীন শোধনাগারগুলো। কিন্তু এখন ইরানি তেলের দাম ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেলের কাছাকাছি চলে আসায় আগের মতো সস্তায় কেনার সুযোগ নেই।
এ ছাড়া সম্ভাব্য নতুন ক্রেতাদের মধ্যে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের এই ছাড় আপাতত ৬০ দিনের জন্য কার্যকর। পাশাপাশি ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় অনেক আন্তর্জাতিক ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়ী এখনও ইরানের সঙ্গে বড় আকারে বাণিজ্যে আগ্রহী নয়।
তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই লাইসেন্স যদি দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাকে, তাহলে ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো পুরোনো ক্রেতারাও আবার ইরানি তেল আমদানি শুরু করতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ও ভূ-রাজনীতি
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের প্রত্যাশিত সুফল এখনও স্পষ্ট নয়। কারণ প্রাথমিক সমঝোতার কয়েক দিনের মধ্যেই ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দেয়। একই সঙ্গে তেহরান জানিয়েছে, তারা এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের চলাচল আরও সক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং সমন্বয়ের জন্য একটি বিশেষ যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করবে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ফলে শুধু তেল রপ্তানিই নয়, ইরানের তেল মজুত কমছে, উৎপাদন বাড়ছে এবং পরিবহন ও আর্থিক লেনদেনের ব্যয়ও কমে যাচ্ছে। ফলে প্রতি ব্যারেল তেল বিক্রিতে দেশটি আগের তুলনায় বেশি মুনাফা করছে।
তাদের মতে, এই নীতি দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাকলে, এর সঙ্গে অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত হওয়া, সম্ভাব্য ট্রানজিট ফি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুত আর্থিক সহায়তা যুক্ত হলে আগামী এক দশকে ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।
সূত্র: দ্য ইকোনোমিস্ট



