চীনের তিস্তা মহাপরিকল্পনায় সহায়তার আশ্বাসের পর ভারত নিজ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। নদী ব্যবস্থাপনা ও জঙ্গিবিমান কেনা নিয়ে নজর রাখছে দিল্লি।
ভারতের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত
শুক্রবার (৩ জুলাই) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ভারতের সহায়তা একটি পারস্পরিক সম্মত রোডম্যাপের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, যা নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়ে থাকে। তিনি আরও বলেন, তিস্তা নদী প্রকল্প নিয়ে ভারতের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান ইতোপূর্বেই বাংলাদেশ পক্ষকে জানানো হয়েছে। তিস্তা ইস্যু সংক্রান্ত ভারতের সামগ্রিক কর্মপন্থা নির্ধারণে এই প্রকল্প ঘিরে সাম্প্রতিক সব ধরনের অগ্রগতি ও দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
চীনের সহযোগিতার আশ্বাস ও ভারতের উদ্বেগ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে ‘তিস্তা নদী ব্যাপক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ (টিসিআরএমপি) নিয়ে ঢাকাকে দেওয়া আশ্বাস নয়াদিল্লির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরকালে এই প্রকল্পে নয়াদিল্লির সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে সেই সফরের দুই মাসের মাথায় দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তার সরকারের পতন ঘটে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন
অবৈধ অনুপ্রবেশসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন চলছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের প্রথম চীন সফরে গিয়ে তারেক রহমান দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং পানিসম্পদ মন্ত্রী লি গুয়োইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। চীন দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন বড় নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে আসছে। এবার তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিস্তা নদীকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এর প্রযুক্তিগত ও বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাইয়ের কাজ ত্বরান্বিত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
তিস্তা প্রকল্পের কৌশলগত গুরুত্ব
তিস্তা প্রকল্পটি ভারতের জন্য রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। বাংলাদেশ মূলত বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নৌযান চলাচল সচল রাখতে এই নদীর পানির প্রবাহ নিশ্চিত ও ব্যবস্থাপনা করতে আগ্রহী। তবে হিমালয় অঞ্চল থেকে উৎপন্ন এই নদীটি সিকিম এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নদীটি ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে বাকি দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
পানি বণ্টন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পানির বণ্টন বরাবরই একটি প্রধান দ্বিপাক্ষিক ইস্যু, কারণ দেশ দুটি প্রায় ৫৪টি অভিন্ন আন্তঃসীমান্ত নদী শেয়ার করে। এর আগে ১৯৯৬ সালে উভয় দেশ গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করতে সক্ষম হয়েছিল, যা এতদিন নয়াদিল্লি ও ঢাকার সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দুই দেশের বিরোধ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ২০১১ সালে নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে একটি তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হলেও শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির তীব্র আপত্তির মুখে তা ভেস্তে যায়।
চীনের সম্পৃক্ততা ও ভবিষ্যৎ
ভারত দীর্ঘ সময় ধরে তিস্তা চুক্তির বিষয়ে কার্যকর কোনো সুরাহা করতে না পারায়, বাংলাদেশ পরবর্তীতে এই নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের সহযোগিতা খোঁজার দিকে এগিয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ারচায়না’ তিস্তা নদীর ওপর একটি প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন তৈরির চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর অর্থনৈতিক ও কৃষি উন্নয়নের জন্য তিস্তা নদী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখন ভূরাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। সূত্র: দ্য প্রিন্ট।



