আইএমএফের জোরালো বার্তা: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সংস্কার অপরিহার্য
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতে ব্যাপক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব সংগ্রহ এবং বিনিময় হার—এই তিনটি ক্ষেত্রেই এখনো অনেক উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ মতামত প্রকাশ করেন।
ওয়াশিংটনে বসন্তকালীন বৈঠক ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল
১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ মোট ১৪ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করছেন। এই বৈঠকটি ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে এবং এতে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশের সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন।
কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনের বাংলাদেশ সফর ও আলোচনা
কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন গত ২৪ মার্চ বাংলাদেশ সফর করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রীসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে নতুন সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক সক্ষমতা এবং চলমান ঋণের কিস্তি ছাড়ের সম্ভাব্য তারিখ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশে গিয়েছিলাম এবং প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। বাংলাদেশের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়েছে। বলেছি, শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আসা সরকারই উচ্চাভিলাষী সংস্কারকাজ হাতে নিতে পারে। তারা আমাদের কথা শুনেছে। এখন আমরা দেখব তারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়।’
রাজস্ব আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান ও পরামর্শ
রাজস্ব আহরণের বিষয়ে কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ভালো করেনি। রাজস্ব সংগ্রহ নিম্নস্তরে রয়েছে এবং গত তিন বছরে এর আরও অবনমন ঘটেছে। তিনি বাংলাদেশকে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর পরামর্শ দেন এবং আর্থিক খাতের অন্যান্য প্রতিবন্ধকতাগুলো বিবেচনায় নেওয়ার উপর জোর দেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের রাজস্ব ভিত্তি তুলনামূলকভাবে ছোট এবং রাজস্ব আহরণ কম হওয়ায় সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশটি বেশি চাপে রয়েছে।
শ্রীলঙ্কার উদাহরণ ও বাংলাদেশের তুলনা
কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন শ্রীলঙ্কার উদাহরণ টেনে বলেন, আইএমএফ-সমর্থিত ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রীলঙ্কা গত তিন বছরে কর রাজস্ব হার বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। দেশটি ধীরে ধীরে আর্থিক সুরক্ষা গড়ে তুলেছে এবং জ্বালানি ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে আছে। তিনি বাংলাদেশের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং সীমিত সম্পদের দক্ষ ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
জ্বালানি ধাক্কা ও এশিয়ার প্রভাব
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশও জ্বালানি ধাক্কায় প্রভাবিত হয়েছে। এ কারণে নীতি-সহায়তা এবং কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে। এই আলোচনা কীভাবে এবং কতটা এগোবে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন বলেন, ‘সহায়তা হওয়া উচিত লক্ষ্যভিত্তিক। আর দরকার সীমিত সম্পদের দক্ষ ব্যবহার। বাংলাদেশের মানুষও কষ্টে আছে। ফলে যে সম্পদই বাংলাদেশের থাকুক না কেন, তার সর্বোচ্চ লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
আইএমএফের ঋণ কিস্তি ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
ঋণের কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে বলে জানান কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য পরে জানানো হবে। আইএমএফের এই বার্তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা দেশের স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।



