ইরান যুদ্ধের উত্তাপে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা, যুক্তরাজ্য সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে: আইএমএফ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে দিয়েছে যে, ইরান যুদ্ধের উত্তাপ আরও বাড়লে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিতে পারে। সংস্থাটির মতে, এই সম্ভাব্য মন্দার প্রভাবে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি উদ্বেগজনক সংকেত।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব ও প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস হ্রাস
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ওয়াশিংটনভিত্তিক আইএমএফ জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। যুদ্ধের বর্তমান প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সংস্থাটি ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের জন্য বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে। আইএমএফের অর্ধবার্ষিক হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম যদি ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়েও নিয়ন্ত্রণে আসে, তবুও জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এ বছর যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি কমবে এবং মুল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকবে।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি
তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে অর্থাৎ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে এবং জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি ১৯৮০ সালের পর পঞ্চম বারের মতো ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়তে পারে। আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়ের-অলিভিয়ের গৌরিনকাস সতর্ক করে বলেন, প্রতিদিন পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি একটি নেতিবাচক পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, যদি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়, তবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশে নেমে আসবে—যাকে বিশ্বমন্দার সমতুল্য ধরা হয়। ১৯৮০ সালের পর এমন পরিস্থিতি কেবল চারবার দেখা গেছে, যার সর্বশেষটি ছিল ২০২০ সালের করোনা মহামারি ও ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দার সময়।
যুক্তরাজ্যের উদ্বেগজনক পূর্বাভাস ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
আইএমএফের সতর্কবার্তার পর ব্রিটিশ চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করেছেন। আইএমএফের বৈঠকে যোগ দিতে ওয়াশিংটন যাওয়ার আগে রিভস বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধ নয়, কিন্তু এর জন্য যুক্তরাজ্যকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। আমি এই ব্যয় চাইনি, কিন্তু এখন আমাদের এর মোকাবিলা করতে হবে।’ তিনি সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করে ‘দ্য মিরর’কে বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং যুদ্ধের ময়দান থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা ছাড়াই কোনো সংঘাতে জড়ানোটা বোকামি। আমি অত্যন্ত হতাশ ও ক্রুদ্ধ যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো এক্সিট প্ল্যান ছাড়াই এই যুদ্ধে জড়িয়েছে।’
আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রবৃদ্ধি কমলেও জ্বালানি আমদানিকারক ও উন্নয়নশীল দেশগুলোই সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে। মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য নিয়ে ট্রাম্পের স্ববিরোধী বক্তব্যের মধ্যেই ২০২৬ সালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ০.১ শতাংশ কমিয়ে ২.৩ শতাংশে নামিয়েছে সংস্থাটি। যুক্তরাজ্যের জন্য এই পূর্বাভাস আরও উদ্বেগজনক। দেশটির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ০.৫ শতাংশ কমিয়ে ০.৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মুল্যস্ফীতি সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ২ শতাংশের দ্বিগুণ অর্থাৎ ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
উত্তরণের পথ ও আইএমএফের পরামর্শ
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আইএমএফ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধ বন্ধের ওপর জোর দিয়েছে। গৌরিনকাস বলেন, ঢালাও ভর্তুকি বা দাম বেঁধে দেওয়ার মতো জনপ্রিয় সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই অকার্যকর ও ব্যয়বহুল প্রমাণিত হয়। এর পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক ও অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। সংস্থাটি বিশ্ব নেতাদের কাছে আহ্বান জানিয়েছে যে, যুদ্ধের উত্তাপ কমানো এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।



