পাকিস্তানে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায়, ভোক্তাদের ওপর চাপ তীব্র
পাকিস্তানে পেট্রোল-ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায়

পাকিস্তানে জ্বালানির দাম রেকর্ড উচ্চতায়, ভোক্তাদের ওপর চাপ তীব্র

পাকিস্তানে পেট্রোল ও হাই-স্পিড ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা দেশের ভোক্তাদের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। বৃহস্পতিবার সরকারের ঘোষণায় পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ১৩৭ রুপি বেড়ে ৪৫৮.৪ পাকিস্তানি রুপিতে উন্নীত হয়েছে, যা প্রায় ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। অন্যদিকে, হাই-স্পিড ডিজেলের দাম ১৮৫ রুপি বেড়ে ৫২০.৩৫ রুপিতে দাঁড়িয়েছে, যা দেশটির ইতিহাসে অন্যতম বড় মূল্যবৃদ্ধি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

মূল্যবৃদ্ধির পেছনের কারণসমূহ

এই দাম বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক তেল বাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কর্মসূচির অধীনে সীমিত আর্থিক সক্ষমতা উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া এবং আইএমএফ অতিরিক্ত ভর্তুকির অনুমতি না দেওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। আইএমএফ জ্বালানি খাতে মোট ভর্তুকির সীমা ১৫২ বিলিয়ন রুপিতে বেঁধে দিয়েছে, যা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।

এছাড়াও, মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা—বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে, যা এই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। সরকার ইতোমধ্যে তিন সপ্তাহ ধরে দাম অপরিবর্তিত রেখে প্রায় ১২৯ বিলিয়ন রুপি ভর্তুকি দিয়েছে, যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪৬ ডলারের বেশি এবং পেট্রোলের দাম প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্যান্য জ্বালানির দাম ও রাজস্ব নীতি

নতুন ঘোষণায় কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ রুপি বেড়ে ৪৬৮ রুপি এবং লাইট ডিজেল অয়েলের দাম ৩০ রুপি বেড়ে ৩৯৫ রুপিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে পেট্রোলের ওপর পেট্রোলিয়াম লেভি লিটারপ্রতি ১০৬ রুপি থেকে বাড়িয়ে ১৬১ রুপিতে উন্নীত করা হয়েছে। তবে হাই-স্পিড ডিজেলের ক্ষেত্রে লেভি তুলে দেওয়া হয়েছে, শুধু লিটারপ্রতি ২.৫ রুপি কার্বন লেভি বহাল রাখা হয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, হঠাৎ করে মজুতদারি ও আতঙ্কে কেনাকাটা ঠেকাতে নির্ধারিত সময়ের একদিন আগেই এই মূল্যবৃদ্ধি ঘোষণা করা হয়েছে। আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং রাজস্ব ঘাটতি এড়াতে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা জরুরি ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী, কৃষক, মোটরসাইকেল চালক এবং গণপরিবহন খাতকে লক্ষ্য করে সীমিত ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সরকারের অন্যান্য ব্যবস্থা ও সমালোচনা

ব্যায় সংকোচনের অংশ হিসেবে সরকার ১০০ বিলিয়ন রুপি উন্নয়ন বাজেট কমিয়েছে, অ-বেতনভুক্ত ব্যায় ২০ শতাংশ কমিয়েছে এবং সরকারি যানবাহনের জ্বালানি সুবিধাও হ্রাস করেছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, একদিকে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সুবিধা-ভোগ কমেনি, যা সামাজিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করছে।

পেট্রোলিয়াম খাতের সংশ্লিষ্টরা নতুন মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এতে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে এবং আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং আয় বৈষম্যের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

ভবিষ্যত প্রভাব ও সরকারের পদক্ষেপ

বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, জ্বালানির দাম আরও বাড়লে তা পরিবহন, বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে প্রভাব ফেলবে এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে, যা অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হতে পারে। সরকার জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন কৌশল নেওয়া হচ্ছে, যাতে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা, রপ্তানি খাতকে সহায়তা দেওয়া এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা যায়।

এর আগে গত ৬ মার্চ পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৫৫ রুপি বাড়ানো হয়েছিল, যা বর্তমান বৃদ্ধির তুলনায় কম ছিল। নতুন এই মূল্যবৃদ্ধি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, এবং সরকারের পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতের জন্য কী প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।