জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক এবং ওপেক প্লাস থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। পাঁচ দশকের বেশি সময় পর মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত জোটটির কার্যত নেতৃত্বদানকারী দেশ সৌদি আরবের জন্য বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি যখন এক নজিরবিহীন জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেই মুহূর্তে আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত তেল রফতানিকারক দেশগুলোর গ্রুপটিকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা
দীর্ঘদিন ধরে ওপেকের সদস্য থাকা আমিরাতের এই বিচ্ছেদ জোটের ভেতর বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। সাধারণত বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু বা উৎপাদনের কোটা নিয়ে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য থাকলেও ওপেক এত দিন নিজেদের একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে আসছিল। তবে আমিরাতের এই প্রস্থান সেই ঐক্যে ফাটল ধরালো।
সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে ১ মে
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে ১ মে। বুধবার ওপেকের ভিয়েনা বৈঠকের আগে এ ঘোষণা দেওয়া হলো। পাশাপাশি জোটের বৃহত্তর অংশ ওপেকপ্লাস থেকেও আমিরাত বেরিয়ে যাচ্ছে।
জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ডব্লিউএএম প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উৎপাদন নীতি, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সক্ষমতা সবকিছু পুনর্মূল্যায়ন করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে আমাদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং বাজারের জরুরি চাহিদা পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি বজায় রাখা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, আরব উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতাসহ স্বল্পমেয়াদি সরবরাহ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করলেও মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বের জ্বালানি চাহিদা বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
নীতি নির্ধারণী পথপরিক্রমায় বিবর্তন
আমিরাতি বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত আমিরাতের নীতি নির্ধারণী পথপরিক্রমায় একটি বিবর্তন। বাজারের গতিশীলতায় সাড়া দেওয়ার নমনীয়তা বাড়ানোর পাশাপাশি সংযত ও দায়িত্বশীল উপায়ে স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখার প্রতিফলন ঘটবে এতে।
তেলনির্ভরতা কমাতে উদ্যোগ
আমিরাতের অর্থনীতিতে এখন অপরিশোধিত তেলখাতের বাইরের অংশের অবদান প্রায় ৭৫ শতাংশ জিডিপিতে। তেলনির্ভরতা কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে দেশটি। তবে ২০২৭ সালের মধ্যে দৈনিক ৩৪ লাখ ব্যারেল উৎপাদন ৫০ লাখে উন্নীত করার আগ্রহও তারা জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে সংকট
ইতোমধ্যে উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রফতানি করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) চলাচল করে। ইরানের তরফ থেকে জাহাজগুলোর ওপর হুমকি ও হামলার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ রুট দিয়ে পণ্য পরিবহন কঠিন হয়ে পড়েছে।
ট্রাম্পের জন্য বড় জয়
এদিকে ওপেকের সদস্যপদ ত্যাগের এই ঘটনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প বরাবরই এই জোটের সমালোচনা করে আসছেন। তার অভিযোগ, ওপেক তেলের দাম বাড়িয়ে ‘পুরো বিশ্বকে ঠকাচ্ছে’। ট্রাম্প উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি মার্কিন সামরিক সমর্থনের বিষয়টিও তেলের দামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ওপেক সদস্যদের সুরক্ষা দিলেও তারা ‘তেলের উচ্চমূল্য আরোপ করে এর সুযোগ নিচ্ছে’।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে আঞ্চলিক নিষ্ক্রিয়তা
এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কাজ করেছে ইরান যুদ্ধ নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিষ্ক্রিয়তা। ওয়াশিংটনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং আঞ্চলিক ব্যবসায়িক কেন্দ্র সংযুক্ত আরব আমিরাত যুদ্ধের সময় ইরানের অসংখ্য হামলার মুখে তাদের রক্ষায় প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর পর্যাপ্ত উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
সোমবার গালফ ইনফ্লুয়েন্সারস ফোরাম-এর এক অধিবেশনে আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ ইরানের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিক্রিয়ার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, লজিস্টিক দিক থেকে জিসিসি (উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা) দেশগুলো একে অপরকে সমর্থন দিয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে আমার মনে হয়, এটি ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থান।
তিনি আরও বলেন, “আমি আরব লীগের কাছ থেকে এমন দুর্বল অবস্থান আশা করেছিলাম, তাই এতে আমি অবাক হইনি। কিন্তু জিসিসির কাছ থেকে এটি আশা করিনি এবং আমি এতে বিস্মিত।”
সূত্র: রয়টার্স, ডব্লিউএএম



