মার্কিন শহরগুলোর সাশ্রয়ী জীবন নিশ্চিতে নিত্যনতুন উদ্যোগ
মার্কিন শহরগুলোর সাশ্রয়ী জীবন নিশ্চিতে উদ্যোগ

যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়েছে। মুদ্রাস্ফীতি আর জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপে পিষ্ট নাগরিকদের সহায়তায় এবার কোমর বেঁধে নেমেছে স্থানীয় প্রশাসন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে সামাজিক নিরাপত্তা সুরক্ষার তহবিল কমিয়ে ফেলায় মার্কিন শহরগুলো এখন নিত্যনতুন ও উদ্ভাবনী পথ খুঁজছে যাতে বাসিন্দাদের সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা প্রদান করা যায়।

ফেডারেল বাজেট হ্রাসের প্রভাব

ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন বাজেট প্রস্তাব ও নীতিমালার কারণে মার্কিন শহরগুলোতে চাপের সৃষ্টি হয়েছে। নতুন কর আইনে এসএনএপি বা খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির প্রশাসনিক ব্যয় ফেডারেল সরকার কমিয়ে দিয়েছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে অঙ্গরাজ্যগুলোর বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে এবং সেবা সংকুচিত হবে।

এছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ২০২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে হাউজিং অ্যান্ড আরবান ডেভেলপমেন্ট বিভাগের বাজেট ১৩ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে গৃহহীনদের সহায়তা, আদিবাসীদের আবাসন এবং কমিউনিটি উন্নয়নের অনুদানও অন্তর্ভুক্ত।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ন্যাশনাল লিগ অব সিটিস-এর মাইকেল ওয়ালেস বলেন, ‘ফেডারেল সরকার এই ব্যবস্থায় যতটুকু অর্থ বিনিয়োগ করেছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় বা মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য কখনোই যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে, তাদের এই ঘাটতি মিটিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।’

সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের ম্যাক্রো-অর্থনীতিবিদ ডিন বেকারের মতে, ‘এটি আংশিকভাবে হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া পদক্ষেপ, তবে এর মধ্যে অনুপ্রেরণাও খুঁজে পাওয়া সম্ভব।’

তবে মূল্য নিয়ন্ত্রণের চেয়ে মজুরি বৃদ্ধিই দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী জীবন নিশ্চিত করতে বেশি কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আবাসন সংকট ও জ্বালানি সাশ্রয়ে শহরগুলো

আবাসন সংকট মোকাবিলায় কিছু শহর ঘরবাড়ি কী, তার সংজ্ঞাই নতুন করে লিখছে। বোস্টনের একটি পরিত্যক্ত গির্জাকে কয়েক ডজন সাশ্রয়ী আবাসন ইউনিটে রূপান্তর করা হচ্ছে। ফ্লোরিডার জ্যাকসনভিলে একটি পুরোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়কে রূপান্তর করা হয়েছে ১২০টি অ্যাপার্টমেন্টে। কানেক্টিকাটে ১৫৫ বছরের পুরোনো একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া টিনসেল মিল থেকে তৈরি হচ্ছে ১৬০টি নতুন আবাসন ইউনিট।

অন্যদিকে, ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ বিলের হাত থেকে বাঁচতে শহরগুলো ছাদে কমিউনিটি সোলার গার্ডেন তৈরি করছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাসিন্দারা নিজেরা প্যানেল না বসিয়ে সম্মিলিতভাবে স্থাপন করা প্যানেল থেকে বিদ্যুৎ নিতে পারছেন। ওয়াশিংটন ডি.সি.-র বাসিন্দারা বছরে ৫০০ ডলার, নিউ ইয়র্কের বাসিন্দারা ১৮০ ডলার এবং মিনেসোটার বাসিন্দারা প্রায় ৩০০ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারছেন।

খাদ্য ও নিত্যপণ্যে নতুন মডেল

খাদ্যদ্রব্যের অভাব রয়েছে এমন এলাকাগুলোতে অনেক শহর নিজস্ব সুপারমার্কেট পরিচালনা বা সহায়তা দিচ্ছে। কানসাসের সেন্ট পল সুপারমার্কেট ২০১৩ সাল থেকে শহর কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করছে, যা সেখানকার ১৬ হাজার বাসিন্দাকে সেবা দিচ্ছে। আটলান্টা ও উইসকনসিনের ম্যাডিসনেও একই মডেল দেখা যাচ্ছে।

লাইব্রেরিগুলোও এখন কেবল বই পড়ার জায়গা নয়, বরং প্রয়োজনীয় সামগ্রী ধার নেওয়ার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মেইনের ব্রান্সউইক শহরের লাইব্রেরি থেকে এখন বাসিন্দারা কাঠের গুঁড়ি কাটার যন্ত্র (উড চিপার), রান্নার সরঞ্জাম থেকে শুরু করে রেডিও পর্যন্ত ভাড়ায় নিতে পারছেন। বাল্টিমোর শহরের বাসিন্দারা লাইব্রেরি থেকে মাছ ধরার ছিপ, ক্যামেরা, মোবাইল হটস্পট এবং কারাওকে কিট সংগ্রহ করতে পারেন।

পরিবহন ব্যবস্থায় পরিবর্তন

ব্যয় কমাতে তুসকন (অ্যারিজোনা), আইওয়া সিটি (আইওয়া) এবং আলেকজান্দ্রিয়া (ভার্জিনিয়া) শহরের মতো অনেক জায়গায় গণপরিবহন ভাড়া তুলে দেওয়া হয়েছে। তবে বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে কানসাস সিটি ২০২০ সালে ভাড়া তুলে দিলেও ২০২৫ সালে তা আবার ফিরিয়ে এনেছে।

গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমাতে অনেক শহর ভাড়ায় বা যৌথ মালিকানা ই-স্কুটার ও ই-বাইকের ব্যবহার উৎসাহিত করছে। ডেনভার শহরের কর্তৃপক্ষ ই-বাইকের জন্য ১ হাজার ৪০০ ডলার পর্যন্ত ভাউচার দিচ্ছে, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। শহরটির বাসিন্দারা এই ভাউচার ব্যবহারের ফলে সপ্তাহে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার মাইল গাড়ির জার্নি এড়িয়ে চলতে পারছেন।

স্থায়ী সমাধান কি আছে?

শহরগুলোর এই প্রচেষ্টাগুলো প্রশংসনীয় হলেও, অর্থনীতিবিদদের মতে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। ইকোনমিক পলিসি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ডেভিড কুপার বলেন, ‘স্থানীয় সরকারের পক্ষে তেলের দাম কমানো সম্ভব নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি সবার বেতন ১০ থেকে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেত, তবে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে এখন আমরা যে আলোচনা করছি, তার বড় অংশই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেত।’

সূত্র: অ্যাক্সিওস