ইরান নিয়ে ইসরায়েলের ৩০ বছরের বয়ান বানোয়াট: নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা ফাঁস
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কয়েক দশক ধরে ইরানকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই পুরো বয়ানই বানোয়াট কল্পকাহিনি। নেতানিয়াহু আসলে ওয়াশিংটনের ওপর ইসরায়েলের প্রভাব দুর্বল হয়ে যাওয়ার ভয়ে এবং এ অঞ্চলের একমাত্র অনিরীক্ষিত পারমাণবিক শক্তি হিসেবে ইসরায়েলের মর্যাদা হুমকির মুখে পড়ার ভয়ে এই মিথ্যা প্রচার চালিয়েছেন।
নেতানিয়াহুর গোপন পরিকল্পনা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু কেবল বোমা হামলার মাধ্যমে ইরানে দ্রুত শাসন পরিবর্তনের ধারণা দিয়ে ট্রাম্পকে বিভ্রান্তই করেননি, বরং পরবর্তী নেতা কে হতে যাচ্ছেন, সেটিও তিনি নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। তিনি ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে মনোনীত করেছিলেন। বিমান হামলা শুরুর মূল লক্ষ্য ছিল প্রথমে খামেনিকে হত্যা করা এবং তারপর আহমাদিনেজাদকে গৃহবন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত করা। ধারণা করা হয়েছিল, আহমাদিনেজাদ এরপর দুর্গ দখল করে ক্ষমতা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবেন। কিন্তু কেবল খামেনি হত্যার অংশটুকু পরিকল্পনামাফিক হয়েছিল।
আহমাদিনেজাদের ভূমিকা
আহমাদিনেজাদের সঙ্গে এই পরিকল্পনার বিষয়ে আগেই পরামর্শ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু তাঁর বাড়ির পাশে ইসরায়েলি হামলায় তিনি আহত হয়েছিলেন। তাঁকেও হত্যা করা হতে পারে, এই সন্দেহে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। বর্তমানে তাঁর অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি। নিউইয়র্ক টাইমসের কাছে মার্কিন বা ইসরায়েলি কোনো কর্মকর্তাই এই রেজিম পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। পত্রিকাটি এ পরিকল্পনাকে ‘দুঃসাহসিক’ বলে অভিহিত করেছে, যদিও এটা বাস্তবতাকে হালকা করে দেখাচ্ছে।
ইরান সম্পর্কে ভুল তথ্য
২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আহমাদিনেজাদ প্রায় প্রতি সপ্তাহেই গণমাধ্যমের শিরোনাম হতেন। ইসরায়েল তাঁকে চরম জুজুতে পরিণত করেছিল। ইরাকের সাদ্দামকে ক্ষমতাচ্যুত ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর আহমাদিনেজাদকেই নতুন হুমকি হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। আহমাদিনেজাদ নাকি পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছেন, যদিও ২০০৩ সালে খামেনি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ করে একটি ফতোয়া জারি করেছিলেন। ২০০৬ সালে তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট বলেছিলেন, ‘হিটলার তার সময়ে যেমন ইহুদি জাতিকে নির্মূলের কথা বলতেন, তিনিও [আহমাদিনেজাদ] একইভাবে বলছেন।’ এটা ছিল তৎকালীন ইসরায়েলি বিরোধীদলীয় নেতা নেতানিয়াহুর প্রচারণারই প্রতিধ্বনি।
গণহত্যার অভিপ্রায়ের মিথ্যা
ইসরায়েলের এই আতঙ্ক লন্ডন অবধি পৌঁছে যায়। ব্রিটিশ এমপিদের উদ্দেশে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘১৯৩০-এর দশকেও কেউ বিশ্বাস করেনি যে হিটলার এমন পদক্ষেপ নিতে সক্ষম। কারণ, তিনি ইহুদি জনগণকে নিশ্চিহ্ন করার কথা স্পষ্টভাবে বলেননি। এর বিপরীতে, ইরানের প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে তাঁর উদ্দেশ্য ঘোষণা করছেন এবং কেউ তাঁকে থামানোর চেষ্টা করছে না।’ সে বৈঠকের সভাপতিত্বকারী সাবেক কনজারভেটিভ ক্যাবিনেট মন্ত্রী মাইকেল গোভ প্রবল উৎসাহে নেতানিয়াহুর কথায় সম্মতি জানিয়েছিলেন। গোভ বলেছিলেন, আহমাদিনেজাদের বক্তব্য ‘কেবল উদ্বেগেরই বিষয় নয়, বরং গণহত্যায় উসকানির শামিল’। ইরানে যে কয়েক শতাব্দী ধরে হাজার হাজার ইহুদি শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছেন, এই সত্য তখন উপেক্ষিত হয়েছিল।
ধোঁয়াশা ও বিভ্রান্তি
দুই দশক আগে নেতানিয়াহুর বার্তাটি ছিল পরিষ্কার: আহমাদিনেজাদ একজন উগ্র ইহুদিবিদ্বেষী, তিনি হিটলারের সঙ্গে তুলনীয়, এবং তিনি পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিতে এতটাই উদ্গ্রীব যে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার নির্দেশ অমান্য করতেও প্রস্তুত। অথচ এখন জানা যাচ্ছে, ইরানের নেতৃত্বের জন্য নেতানিয়াহুর পছন্দ আহমাদিনেজাদকেই। এ জন্য এমন একজনকে [খামেনি] হত্যা করতেও পিছপা হলেন না, যিনি কিনা আবার পারমাণবিক অস্ত্রের ঘোরতর বিরোধী। নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, আহমাদিনেজাদ ও তাঁর লোকজনের সঙ্গে ইসরায়েল, ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে ইরানের ভেতরে প্রবল সন্দেহ ছিল। এই সন্দেহগুলো এখন সত্য বলে মনে হচ্ছে।
ভুল অনুবাদ ও মিথ্যা প্রচার
২০০৮ সালে লেখা একটি কলামে উল্লেখ করা হয়েছিল, ইসরায়েল ইরান সম্পর্কে যা বলছিল, তার কোনোটাই বিশ্বাসযোগ্য নয়। আহমাদিনেজাদের গণহত্যার অভিপ্রায় নিয়ে যে দাবি করা হয়েছিল, সেটা ছিল তাঁর বক্তব্যের ভুল অনুবাদ। তিনি সেখানে প্রয়াত আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছিলেন। পশ্চিমা রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমের মতে, আহমাদিনেজাদ ইসরায়েলকে ‘মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার’ আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি খোমেনিকে উদ্ধৃত করছিলেন, যিনি বলেছিলেন, অন্য একটি জাতিকে নিপীড়ন করে ইসরায়েল অবৈধ ইহুদিবাদী রাষ্ট্র আকারে অনন্তকাল টিকে থাকতে পারে না। বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রে যেমন ঘটেছিল, একইভাবে বর্ণবাদী রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের দিন যে ফুরিয়ে এসেছে।
হলোকাস্ট সম্মেলনের ভুল ব্যাখ্যা
একইভাবে ২০০৬ সালে আহমাদিনেজাদ তেহরানে একটি সম্মেলন আহ্বান করলে এটাকে ‘হলোকাস্ট অস্বীকারকারী’ সম্মেলন হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু এই আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েল সম্পর্কে পশ্চিমা ট্যাবুগুলোকে চ্যালেঞ্জ করা এবং মুসলমানদের প্রতি পশ্চিমাদের ভণ্ডামিকে তুলে ধরা। আহমাদিনেজাদের যুক্তি ছিল দ্বিমুখী: প্রথমত, যদি মুসলমানরা পশ্চিমাদের কাছ থেকে তাদের বিশ্বাস ও অনুভূতির প্রতি সম্মান পাওয়ার অধিকারী না হয়, তবে পশ্চিমারা কেন আশা করবে যে ইসরায়েল ও হলোকাস্ট সম্পর্কে তাদের নিজস্ব অনুভূতিগুলো চ্যালেঞ্জের ঊর্ধ্বে থাকবে? দ্বিতীয়ত, ইউরোপের ইহুদিদের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের করা অপরাধের জন্য কেন ফিলিস্তিনিদের কয়েক দশকের উচ্ছেদ ও নির্যাতনের মতো চড়া মূল্য দিতে হবে?
মিথ্যার উদ্দেশ্য
এই মিথ্যাগুলোর উদ্দেশ্য একই: ইরানে আক্রমণের বৈধতা দেওয়া; এ অঞ্চলের ওপর ইসরায়েলের ছড়ি ঘোরানোর অধিকার সুরক্ষিত রাখা। আগে করা হতো নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে, এখন করা হচ্ছে বোমা হামলার মাধ্যমে। ইরান এখন হরমুজ প্রণালি ও বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ওপর থেকে তার নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। তারা দাবি করছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল পরিচালিত এই ভুতুড়ে দৃশ্যে মার্কিন সমর্থন বন্ধ করতে হবে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিকতম জেদ হচ্ছে, বেশির ভাগ আরব রাষ্ট্রকে ইসরায়েলের সঙ্গে তথাকথিত ‘আব্রাহাম চুক্তি’ স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা। এটাকে আঞ্চলিক ‘শান্তিচুক্তি’র রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরা হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ ক্ষমতাধর হিসেবে ইসরায়েলের অবস্থানকে পাকাপোক্ত এবং আরব রাষ্ট্রের স্বার্থগুলোক ইসরায়েলের অধীন করতেই এই চুক্তির নকশা করা হয়েছে। এটা ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’–এর মতো আরেকটি প্রতারণা, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অপরাধমূলক আগ্রাসন ও গণহত্যাকে শান্তির মোড়কে হাজির করে।
সহজ সত্য
গত ২০ বছরের নির্জলা মিথ্যা একটা সহজ সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করেছে: তেহরান কোনো অপ্রকৃতিস্থ, গণহত্যাকারী ও ক্ষমতালোভী উন্মাদ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে না, বরং তেল আবিব ও ওয়াশিংটন হচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন শুরু করার পর থেকে তেহরান সংযম দেখিয়ে যাচ্ছে, সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছে এবং আন্তরিকভাবে আলোচনার সদিচ্ছা প্রদর্শন করছে। কিন্তু অন্যপক্ষে কোনো দায়িত্বশীল মানুষ নেই, যাঁদের সঙ্গে তারা কোনো চুক্তি করতে পারে।
লেখক: জোনাথন কুক, সাংবাদিক ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ। মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত।



