জনসংখ্যা হারানো মার্কিন শহরগুলোতে নীরব সংকট
জনসংখ্যা হারানো মার্কিন শহরগুলোতে নীরব সংকট

টেক্সাসের সেলিনা কিংবা নর্থ ক্যারোলাইনার অ্যাপেক্সের মতো উপশহরগুলো যখন জনসংখ্যা আর অর্থনীতিতে প্রতিনিয়ত ফুলেফেঁপে উঠছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের শত শত জনপদ হারাচ্ছে তাদের বাসিন্দা। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই নীরব সংকট মার্কিন শহরগুলোর গভীর কাঠামোগত পতনকে স্পষ্ট করে তুলছে। বাসিন্দা কমে যাওয়া এই শহরগুলোতে দারিদ্র্য ঘনীভূত হচ্ছে, অবকাঠামো বুড়িয়ে যাচ্ছে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এমনকি তরুণেরা এই শহরগুলো ছেড়ে চলে যাওয়ায় সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও শিক্ষক আকর্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

শুমারি বিশ্লেষণে উদ্বেগজনক তথ্য

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক শুমারি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের মধ্যে ২০ হাজার বা তার বেশি জনসংখ্যার প্রায় ৬০০টি শহর তাদের বাসিন্দা হারিয়েছে। এই দ্রুত হ্রাস পাওয়া শহরগুলোর বেশির ভাগই দক্ষিণাঞ্চলের কৃষ্ণাঙ্গপ্রধান এলাকা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মেক্সিকান-আমেরিকান ও আদিবাসী আমেরিকানদের শহর কিংবা মিডওয়েস্টের পুরোনো শিল্পাঞ্চল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, টেক্সাসের বিগ স্প্রিং শহরটি ২০২০ সালের পর থেকে ১৫.৩ শতাংশ বাসিন্দা হারিয়েছে, যা ২০ হাজার বা তার বেশি জনসংখ্যার যেকোনও মার্কিন শহরের মধ্যে সর্বোচ্চ পতনের রেকর্ড। দ্বিতীয় স্থানে থাকা মিসিসিপির গ্রিনভিল শহরের জনসংখ্যা ২৯ হাজার ৬৯০ থেকে ১০.৬ শতাংশ কমে ২৬ হাজার ৫৩০ জনে দাঁড়িয়েছে। আদিবাসী বাণিজ্যের কেন্দ্র নিউ মেক্সিকোর গ্যালাপ শহরটি হারিয়েছে ৮.৮ শতাংশ বাসিন্দা। স্থানীয় অর্থনৈতিক ‘ধসের’ কারণে শহরটির দৈনিক পত্রিকা দ্য গ্যালাপ ইন্ডিপেনডেন্ট চলতি বছরের জানুয়ারিতে বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান এর প্রকাশক বব জলিঙ্গার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ

বিগ স্প্রিং শহরের এই পতনের মূল কারণ ২০২১ সালে দুটি বেসরকারি ফেডারেল ডিটেনশন সেন্টার বা আটক কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া, যার ফলে শত শত মানুষ চাকরি হারান। এ ছাড়া এই অঞ্চলের ভাগ্য দীর্ঘদিন ধরে তেলের অর্থনীতির ওঠানামার সঙ্গে জড়িত। দ্রুত সংকুচিত হওয়া শীর্ষ ১০টি শহরের মধ্যে তিনটিই মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের, এগুলো হলো- গ্রিনভিল, ভিকসবার্গ ও জ্যাকসন। এই তিনটিই কৃষ্ণাঙ্গপ্রধান শহর এবং দীর্ঘদিনের বিনিয়োগহীনতা, উচ্চ দারিদ্র্য হার, ভঙ্গুর অবকাঠামো ও তরুণদের অন্যত্র চলে যাওয়ার মতো বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি। ক্যালিফোর্নিয়ার টুয়েন্টিবাইন পামস শহরটিও ৭.৬ শতাংশ বাসিন্দা হারিয়েছে, তবে সেখানে মার্কিন মেরিন কর্পসের একটি ঘাঁটি থাকায় এই হ্রাস মূলত সামরিক মোতায়েন চক্রের কারণেও হতে পারে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অবকাঠামো ও বিনিয়োগের অসম বণ্টন

যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের পর লাখ লাখ নতুন বাড়িঘর তৈরি হলেও তার প্রায় পুরোটাই হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চল ও মাউন্ট ওয়েস্টের সমৃদ্ধ মেট্রো এলাকাগুলোতে; দ্রুত সংকুচিত হওয়া এই জনপদগুলোতে কোনো নতুন নির্মাণ হচ্ছে না। অবশ্য জনসংখ্যা হ্রাস মানেই যে সব শেষ, তা নয়। যেমন, সেন্ট লুইস শহরটি গত ৭০ বছর ধরে ছোট হয়ে আসলেও সেখানে এখনও সচল নাগরিক অর্থনীতি, বড় বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঞ্চলিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা টিকে আছে।

জাতিগত বৈষম্যের ভূমিকা

তবে এই পতনের পেছনে জাতিগত বৈষম্যকে এড়ানো অসম্ভব। মিসিসিপি, আরকানসাস ও লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের শীর্ষ ১০টি সংকুচিত শহরের বেশির ভাগই কৃষ্ণাঙ্গপ্রধান, যারা দশকের পর দশক ধরে চলে আসা বিনিয়োগহীনতা থেকে কখনোই পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। অন্যদিকে, সরকারি আবাসন ও অবকাঠামোর তহবিল এখন চলে যাচ্ছে দ্রুত বর্ধনশীল উপশহরগুলোর দিকে, যেখানে নতুন রাস্তা ও স্কুলের প্রয়োজন। ফলে জনসংখ্যা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়ায় এই সংকুচিত শহরগুলো টিকে থাকার জন্য সীমিত সম্পদ নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে।