ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চলমান সংঘাত নিয়ে সিআইএ ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এক গোপন প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে জনসমক্ষে যে দাবি করছেন, বাস্তব চিত্র তার সম্পূর্ণ উল্টো।
ইরানের সামরিক শক্তি: ট্রাম্পের দাবির বিপরীতে বাস্তবতা
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদী হামলা ও অবরোধ সত্ত্বেও ইরানের ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ এখনো পুরোপুরি অক্ষত রয়েছে। এছাড়া তাদের ৯ শতাংশ ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্র বর্তমানে সচল রয়েছে। গত ৯ মার্চ ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে ইরানের সামরিক শক্তি ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, হরমুজ প্রণালির পাশেই অবস্থিত ৩৩টি ঘাঁটির মধ্যে ৩০টিই ইরান পুনরায় সক্রিয় করে তুলেছে।
মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের সংকট
এই সামরিক শক্তি পুনরুদ্ধারের ফলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও তেলের ট্যাঙ্কারগুলো এখন চরম ঝুঁকির মুখে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তার অস্ত্রের মজুদ নিয়ে সংকটে পড়েছে। গত কয়েক মাসের যুদ্ধে পেন্টাগন প্রায় ১,১০০টি স্টিলথ ক্রুজ মিসাইল এবং ১,০০০-এর বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, যা তাদের বার্ষিক সংগ্রহের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। এছাড়া ১৩০০-এর বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারের ফলে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও চাপের মুখে পড়েছে।
ইরানের পাঁচ শর্তে শান্তি প্রস্তাব
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সরাসরি ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে বলেছে, তাদের ‘এপিক রেজ’ অপারেশন ব্যর্থ হয়েছে। ইরান বর্তমানে কোনো পরাজিত পক্ষ হিসেবে নয়, বরং বিজয়ী শক্তি হিসেবে শান্তির জন্য পাঁচটি কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছে। তেহরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—লেবানন ও গাজাসহ সকল ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা, সকল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জব্দকৃত সম্পদ ফেরত দেওয়া, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সার্বভৌম অধিকারের স্বীকৃতি, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অলঙ্ঘনীয় অধিকার।
ওয়াশিংটনের কৌশলগত অচলাবস্থা
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের এই শর্তগুলোকে ‘আত্মসমর্পণের চিঠি নয়’ বলে প্রত্যাখ্যান করলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওয়াশিংটন বর্তমানে এক কৌশলগত অচলাবস্থায় রয়েছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলছেন যে তার একমাত্র লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে দূরে রাখা, এমনকি এর ফলে মার্কিন অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি বা খাদ্যের দাম বাড়লেও তিনি বিচলিত নন। তবে হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, পেন্টাগন যুদ্ধের খরচ ২৯ বিলিয়ন ডলার দেখালেও বাস্তবে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে চীন এখন পাকিস্তানকে মধ্যস্থতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে যাতে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া যায়। দোহা ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক মোহাম্মদ এলমাসরি মনে করেন, ইরান এই লড়াইকে তাদের অস্তিত্বের যুদ্ধ হিসেবে দেখছে, তাই তারা কোনোভাবেই আত্মসমর্পণ করবে না। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে একটি সমঝোতা চুক্তিতে আসতে বাধ্য হতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন। বর্তমানে ওয়াশিংটনে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যারা ইরানের সামরিক সাফল্যের কথা বলছেন, হোয়াইট হাউস তাদের ‘গাদ্দার’ বা ‘বিপ্লবী গার্ডের প্রতিনিধি’ হিসেবে অ্যাখ্যা দিচ্ছে। কিন্তু গোয়েন্দা তথ্যের ফাঁস হওয়া নতুন বাস্তবতা ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।



